সম্প্রতি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক বিস্ফোরক অভিযোগে বইপাড়া থেকে রাজনৈতিক অলিন্দ— সর্বত্র নতুন করে চর্চায় উঠে এসেছে ‘বইয়ের রয়্যালটি’ (Book Royalty)। মমতার দাবি, রাজনীতির শিকার হয়ে দুটি নামজাদা প্রকাশনা সংস্থা নাকি তাঁর লেখা বইয়ের রয়্যালটির টাকা আটকে দিয়েছে! যেখানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বইয়ের রয়্যালটি ও আঁকা ছবির আয় থেকেই তাঁর সংসার চলত, সেখানে এই বকেয়া রয়্যালটি বিতর্ক ফের এক মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সাধারণ পাঠক ও সাহিত্য সমাজকে— আদতে কী এই ‘রয়্যালটি’? এটি কীভাবে কাজ করে এবং লেখক ও প্রকাশকের আইনি বা নৈতিক সম্পর্কটাই বা ঠিক কীরকম?

সহজ কথায়, কোনও লেখকের সৃষ্ট মেধা স্বত্ব (Intellectual Property) যখন কোনও প্রকাশক বাণিজ্যিকভাবে ছেপে বিক্রি করেন, তখন প্রতি কপি বিক্রির বিপরীতে যে নির্দিষ্ট শতাংশ টাকা লেখক লাভ করেন, সেটাই রয়্যালটি। কিন্তু এই ব্যবস্থা একদিনে গড়ে ওঠেনি। অতীতে এই খাতাটি ছিল অত্যন্ত অসংগঠিত। জানা যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই চরম জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর সময় চিকিৎসাসঙ্কট ও চরম আর্থিক অনটনে কেটেছে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ভুগেছেন অর্থকষ্টে! সে যুগে অনেক সময় লেখকদের থেকে এককালীন (Lump sum) কিছু টাকায় পাণ্ডুলিপি কিনে নেওয়া হতো।

ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ১৪৪০-এর দশকে জোহানেস গুটেনবার্গের ছাপাখানা উদ্ভাবনের আগে ও ঠিক পরে লেখকদের আয়ের কোনও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল না। লেখকরা মূলত রাজা, জমিদারি কিংবা বিত্তশালীদের অনুদানের ওপর নির্ভর করতেন। ছাপাখানা আসার পর প্রকাশকরা লেখকদের কাছ থেকে খুব সামান্য মূল্যে পাণ্ডুলিপিটি চিরতরে কিনে নিতেন । বই ছাপিয়ে প্রকাশক প্রচুর লাভ করলেও লেখক আর এক পয়সাও পেতেন না। ১৭১০ সালে ব্রিটেনে ‘স্ট্যাটিউট অব অ্যান’ (Statute of Anne) পাস হয়, যা বিশ্বের প্রথম মেধা স্বত্ব বা কপিরাইট আইন হিসেবে পরিচিত। এই আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয় যে— একটি লেখার আসল স্বত্ব বা মালিকানা লেখকের, কোনও ছাপাখানা বা প্রকাশকের নয়। এই আইনটিই পরবর্তীতে রয়্যালটি ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ প্রকাশক জন মারে এবং টমাস মেকলে লেখকদের সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন পদ্ধতি চালু করেন। তারা এককালীন টাকা দেওয়ার বদলে বিক্রির ওপর শতাংশের (Percentage) ভিত্তিতে টাকা দেওয়া শুরু করেন। ঠিক একই সময়ে মার্কিনযুক্ত রাষ্ট্রে ১৮৩৯ সালে জন্স মেটকাফ নামে এক প্রকাশক প্রথমবারের মতো লেখকদের প্রতি কপি বই বিক্রির বিপরীতে চুক্তিভিত্তিক রয়্যালটি দেওয়ার প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করেন।

১৯ শতকের মাঝামাঝি চার্লস ডিকেন্স, মার্ক টোয়েন-এর মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখকরা প্রকাশকদের একচেটিয়া শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তাদের আন্দোলন ও জনপ্রিয়তার জোরেই বিশ্বজুড়ে প্রকাশকরা ‘এককালীন কেনা’র নীতি থেকে সরে এসে রয়্যালটি চুক্তি (Royalty Agreement) স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। ১৮৮৬ সালে পঠিত ‘বের্ন কনভেনশন’ (Bern Convention) আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লেখকদের মেধা স্বত্ব সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে।

বাংলার বই বাজার ও রয়্যালটি সিস্টেম–

এতো গেল রয়্যালটির ইতিহাস। বর্তমান সময়ে কীভাবে নির্ধারিত হয় এই রয়্যালটির হার? বিশেষ করে বাংলার বই বাজারে কীভাবে চলে এই রয়্যালটি নিয়ম। বাংলা সাহিত্য জগতে রয়্যালটির সাধারণ কাঠামো নিয়ে পত্রভারতী প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার ও সাহিত্যিক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় TV9 বাংলার কাছে তুলে ধরেছেন বই পাড়ার অন্দরের কথা। তাঁর কথায়, “আমাদের বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে মুদ্রিত মূল্যের (MRP) উপর ন্যূনতম ১০ শতাংশ রয়্যালটি দেওয়া হয়। কোনও বইয়ের দাম ১০০ টাকা হলে লেখক পাবেন ১০ টাকা। আর যাঁরা অতি বিশিষ্ট ও নামী লেখক, তাঁদের ক্ষেত্রে ক্ষেত্রবিশেষে ১২.৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত রয়্যালটি দেওয়া হয়।”

তিনি আরও জানান, কেবল লেখকের জীবদ্দশাতেই নয়, আইনি নিয়ম অনুযায়ী লেখকের মৃত্যুর পর ষাট বছর পর্যন্ত তাঁর উত্তরাধিকারীরা এই রয়্যালটি পেয়ে থাকেন। ষাট বছর পার হলে বইটি মেধা স্বত্ব বা ‘কপিরাইট মুক্ত’ (Copyright free) হয়ে যায়, যা বাজার থেকে যেকোনও প্রকাশক ছাপতে পারেন— যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই এখন মুক্ত। ত্রিদিববাবুর মতে, “প্রকাশক ও লেখকের সম্পর্ক অনেকটা স্বামী-স্ত্রীর মতো, যা সম্পূর্ণ পারস্পরিক বোঝাপড়ার উপর নির্ভর করে।”

একই সুর পাওয়া গেল আরেক ঐতিহ্যবাহী ‘করুণা প্রকাশনী’র কর্ণধার কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কথায়। প্রকাশনা ও লেখকের স্বচ্ছতার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, “লেখক কতখানি জনপ্রিয় এবং প্রকাশকের সঙ্গে তাঁর চুক্তি কেমন, তার ওপর নির্ভর করে রয়্যালটি ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যেমন প্রফুল্ল রায়ের পরিবারকে আমরা এখনও ২০ শতাংশ রয়্যালটি দিই। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বা নারায়ণ সান্যালের পরিবারকেও নিয়ম মেনে রয়্যালটি পাঠানো হয়। ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত কত কপি বই বিক্রি হল, তার পরিষ্কার হিসাব বা স্টেটমেন্ট ফর্ম সহ লেখক বা তাঁর পরিবারকে জানানো হয়।”

তবে আধুনিক যুগে রয়্যালটি কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে আটকে নেই, যুক্ত হয়েছে কড়া হিসাব ও আইনি চুক্তি। জনপ্রিয় লেখক দেবারতি মুখোপাধ্যায় কর্পোরেট ও বড় হাউজগুলোর কাজের ধরন নিয়ে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন। তিনি জানান, “বড় হাউজগুলোর নিজস্ব অ্যাকাউন্টস ও অডিট সিস্টেম থাকে। সাধারণত প্রথম সংস্করণে ১০-১৫ কপি সৌজন্যমূলক বই (Complimentary copies) লেখককে দেওয়ার পর বিক্রি হওয়া প্রতিটি কপির শতাংশ হিসাব করা হয়। আগে লেখকেরা এককালীন টাকা নিতেন, কিন্তু এখন অনেকে অ্যাডভান্স (Advance) নেন যা পরবর্তীতে রয়্যালটির সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করা হয়।”

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে দেবারতি আরও যোগ করেন, “আগের চেয়ে লেখকরা এখন অনেক সচেতন। কপিরাইট আইন এবং লিখিত এগ্রিমেন্ট রয়েছে। বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক বছর (Financial Year) শেষে স্পষ্ট ‘স্টক স্টেটমেন্ট’ বা কত কপি বিক্রি হল তার হিসাব দেখে রয়্যালটি মেটানো হয়। এর পাশাপাশি অনেক ছোট বা নতুন হাউজগুলোও এখন প্রকাশনার ধরণ বদলে ‘পাবলিশ অন ডিমান্ড’ (Publish on Demand) নীতিতে কাজ করছে।”

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশকদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অবশ্য ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন। লেখক হিমাদ্রি কিশোর দাশগুপ্ত যেমন প্রকাশনা সংস্থাগুলোর পেশাদারিত্বেই আস্থা রাখছেন। তিনি বলেন, “যাঁরা নতুন আসেন, হয়তো তাঁদের ক্ষেত্রবিশেষে কিছু সমস্যা হয়, তবে বাংলা বইয়ের বাজারে সাধু বা সৎ প্রকাশকের সংখ্যাই বেশি। মাননীয়া প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যে প্রকাশনা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছেন, কাকতালীয়ভাবে সেই সংস্থায় আমারও বই রয়েছে। আমি কিন্তু আজ পর্যন্ত সঠিক সময়ে রয়্যালটি ও হিসাব পেয়ে এসেছি, কোনওদিন সমস্যা হয়নি।”



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *