খবর অনলাইন ডেস্ক: হিন্দি চলচ্চিত্রজগতের অন্যতম কিংবদন্তি অভিনেত্রী মীনা কুমারী এবং বিশিষ্ট কবি-গীতিকার-চলচ্চিত্র পরিচালক গুলজার—দু’জনের সম্পর্কের ভিত ছিল গভীর শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আন্তরিক বন্ধুত্ব। জীবনের শেষ সময়ে মীনা কুমারী নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, ব্যক্তিগত ডায়েরি ও কবিতার খাতা গুলজারের কাছেই রেখে যান।

প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হন গুলজার

১৯৬৫ সালে ‘বেনজির’ ছবির সেটে প্রথমবার কাছ থেকে মীনা কুমারীকে দেখেন তরুণ গুলজার। তবে তারও আগে ১৯৫৩ সালের ‘দো বিঘা জমিন’ ছবির শুটিং চলাকালীন তাঁকে দেখেছিলেন। পরে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, মীনা কুমারী কোনও চরিত্রে নিজেকে বদলে ফেলতেন না, বরং চরিত্রই যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেত। তাঁর সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব এবং উর্দু ভাষার উপর অসাধারণ দখল গুলজারকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল।

– বিজ্ঞাপন –

ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়ের মধ্যেও অটুট ছিল বন্ধুত্ব

ক্যারিয়ারের শিখরে থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল মীনা কুমারীকে। পরিচালক কামাল আমরোহির সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্কে বহুবার টানাপোড়েন তৈরি হয়। সেই সময় তাঁকে ঘিরে নানা গুঞ্জনও ছড়ায়। কিন্তু এ সব বিষয়ে তিনি খুব কমই মুখ খুলতেন। একই সময়ে গুলজারের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। তাঁদের সম্পর্ক নিয়েও নানা জল্পনা হয়েছিল, তবে দু’জনেই সবসময় মর্যাদা ও নীরবতা বজায় রেখেছিলেন।

‘মেরে আপনে’ ছবির শুটিংয়ে গুরুতর অসুস্থ হন মীনা

১৯৭১ সালে পরিচালক হিসেবে গুলজারের প্রথম ছবি ‘মেরে আপনে’ মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন মীনা কুমারী। তখন তাঁর বয়স মাত্র ত্রিশের কোঠায় হলেও তিনি লিভারের সিরোসিসে গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। দীর্ঘদিনের মদ্যপানের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছিল।

অসুস্থতা সত্ত্বেও কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ছিল অনন্য। গুলজার শুটিংয়ের আগে তাঁর পাশে বসে দৃশ্য পড়ে শোনাতেন, আর চোখ বন্ধ করে মন দিয়ে শুনতেন মীনা। গুলজারের মতে, তিনি যেন সংলাপ ও দৃশ্যের আবেগ নিজের ভেতরে ধারণ করে নিতেন।

ছবির একটি লোরি বা ঘুমপাড়ানি গান তাঁর ওপর চিত্রায়ণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অসুস্থতা এতটাই বেড়ে যায় যে সেই দৃশ্য আর শুট করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

মীনা কুমারীর জন্য রমজানে রোজা রাখা শুরু করেন গুলজার

জীবনের শেষ দিকে অসুস্থতার কারণে রমজানে নিয়মিত ওষুধ খেতে হত মীনা কুমারীকে। তাই তিনি রোজা রাখতে পারছিলেন না। এতে তিনি খুব কষ্ট পেতেন। তখন গুলজার তাঁকে ওষুধ খাওয়ার অনুরোধ করে বলেন, তিনি তাঁর হয়ে রোজা রাখবেন।

এই ঘটনার পর থেকেই গুলজার রমজানে রোজা রাখা শুরু করেন। শুধু মীনা কুমারীর জীবদ্দশায় নয়, তাঁর মৃত্যুর পরও বহু বছর সেই প্রতিশ্রুতি পালন করেছিলেন বলে জানা যায়।

মৃত্যুর আগে গুলজারের হাতে তুলে দেন ডায়েরি ও কবিতা

১৯৭২ সালের ৩১ মার্চ মীনা কুমারীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ডায়েরি, নোটবই এবং কবিতার পাণ্ডুলিপি গুলজারের কাছে রেখে যান।

‘নাজ’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন মীনা কুমারী। গুলজারের মতে, তাঁর লেখায় ছিল গভীর সংবেদনশীলতা ও ব্যক্তিগত অনুভূতির ছাপ। যদিও অনেকের ধারণা ছিল, তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য রয়েছে, গুলজার সেই ধারণা নাকচ করে জানান, সেখানে কোনও কেলেঙ্কারির গল্প নেই। বরং ডায়েরির পাতায় ফুটে উঠেছে এক সংবেদনশীল মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও কাব্যিক মনন।

মীনা কুমারীর শেষযাত্রাতেও উপস্থিত ছিলেন গুলজার। প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে তিনি গভীর শোকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন—যা তাঁদের আন্তরিক সম্পর্কের এক নীরব সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *