রবিবার রাতে কেঁপে উঠেছে ভুটান। দুলেছে উত্তরের পাহাড়-সমতল। সেই রেশ না-কাটতে সোমবার সকালে ফিলিপিন্সের দক্ষিণাঞ্চলের মিন্ডানাও শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে। পরিস্থিতি দেখে আতঙ্ক ছড়িয়েছে দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এক রাতে বারোবার ভূমিকম্প হয় সিকিমে। তার প্রভাব পড়েছিল উত্তরের পাহাড়-সমতলে। প্রশ্ন উঠেছে, ফিলিপিন্সের মতো রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা যদি ৮.২ অথবা কাছাকাছি হয় পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে উত্তরের!
এমন উদ্বেগ অস্বাভাবিক নয়। ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি এবং ইউনাইটেড স্টেট জিওলজিকাল সার্ভের গবেষণা সূত্রে জানা গিয়েছে, গত এক দশকে দার্জিলিং-কালিম্পং পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকায় চারশোর বেশি ভূমিকম্প হয়েছে। বছরে গড়ে ৪৩ এবং মাসে ৩ বার এখানকার মাটি কেঁপেছে। কিন্তু বেশিরভাগ ভূমিকম্পের রিখটার স্কেলে মাত্রা ৪-এর কম থাকায় তেমন গুরুত্ব পায়নি। তবে ভূমিকম্প ভূমিধসের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় শৈল শহরের বিপদ বাড়ছে। গবেষকদের মতে, প্রতি ৪০ থেকে ৪৫ বছরের ব্যবধানে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের কবলে পড়ছে দার্জিলিং পাহাড়। তাই শঙ্কা থেকেই গিয়েছে এখানেও কি নেপাল অথবা ফিলিপিন্সের মতো পরিনতি দেখতে হবে! রবিবার রাতে ভুটানে কম্পনের তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৭। ভূমিকম্প মাঝারি তীব্রতার হলেও উৎসস্থল কাছাকাছি থাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায়। তথ্য বলছে ভুটান পাহাড়ে ৮ মাত্রায় ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। ১৭১৪ সালে ওই দেশে রিখটার স্কেলে প্রায় ৮.১ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়। ভুটান লাগোয়া ভারতের সিকিম রাজ্য। সেখানে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এক রাতে বারোবার ভূমিকম্প হয়। কম্পনের ধাক্কা উত্তরের পাহাড়-সমতলেও পৌঁছেছে। দার্জিলিং পাহাড়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। শুধু তাই নয়। নেপালের মতো ভয়াবহ ভূমিকম্প যে এখানেও হতে পারে সেই ইঙ্গিত ইতিমধ্যে দিয়ে রেখেছে ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (বিআইএস)।
আরও পড়ুন:
২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপালে যে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয় রিখটার স্কেলে তার মাত্রা ছিল ৭.৬। ওই বিপর্যয়ে ৯ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ যায়, জখম হয় ২২ হাজারের বেশি। সাড়ে ৭ লক্ষ বাড়ি মাটিতে মিশে যায়। তথ্য বলছে, দার্জিলিং পাহাড়ে নেপালের চেয়েও তীব্র ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। ১৯০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি যে ভূমিকম্প এখানে হয়েছিল রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিলো ৮। গত বছরের ৭ জানুয়ারি রিখটার স্কেলে ৭.১ মাত্রায় ভূমিকম্প হয়েছে এখানে। গবেষণার তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দার্জিলিং পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকায় প্রচুর ভূমিকম্প হয়েছে। ওই বছর ১৭৮টি ভূমিকম্প শনাক্ত করা হয়। রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৪। সবচেয়ে শক্তিশালীটির মাত্রা ছিল ৭.১। চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ তথা ভূ-গবেষক মধুসূদন কর্মকার বলেন, “গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, দার্জিলিং পাহাড়ে প্রতি বছর গড়ে ২৩টি ভূমিকম্প হয়। প্রায় প্রতি ৪০ থেকে ৪৫ বছর অন্তর ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটে।” তিনি জানান, ভূমিকম্প ভূমিধসের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় শৈল শহরের বিপদ বেড়েছে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা সূত্রে জানা গিয়েছে, আশির দশক থেকে ধস দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ে নিয়মিত বাৎসরিক ঘটনা হয়েছে। এর আগে ধসের ঘটনা ঘটেনি তেমন নয়। কিন্তু এখনকার মতো প্রতিবছর একাধিক নয়। গবেষকরা মনে করছেন এর অন্যতম প্রধান কারণ, ভারতীয় প্লেট ইউরেশিয়ান প্লেটের নীচে চলে যাওয়ায় প্রায়ই ছোটখাটো ভূমিকম্প। তবে শুধু দার্জিলিং, কালিম্পং, সিকিম নয়, রিখটার স্কেলে ৬-এর উপরে ভূমিকম্প হলে শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি সহ উত্তরের প্রতিটি শহর-গ্রাম বিধ্বস্ত হবে। কারণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ সর্বত্র চলছে। বহুতলে ভরেছে প্রতিটি শহর। গবেষকদের মতে এটাই ভূমিকম্পের সময় ‘ডোমিনো প্রভাব’ সৃষ্টি করতে পারে। স্বভাবতই প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বাড়বে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
