ডাউকি ফল্টের কারণে ভূমিকম্পের ডেঞ্জার জোনে (বিপজ্জনক অঞ্চল) সিলেটের অবস্থান। অতীতে সিলেটে একাধিক ভূমিকম্প হয়েছে। যেকোনো সময় আবার সিলেটে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, রিখটার স্কেলে ৬ বা তার বেশিমাত্রার ভূমিকম্প হলে সিলেট নগরীতে বিপুল প্রাণ ও সম্পদহানি ঘটবে। এমন বাস্তবতায় সিলেটে আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ না করা, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিল্ডিং কোড মেনে চলা এবং পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভেঙে ফেলার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১৯ সালে সিলেটে অল্পদিনের ব্যবধানে কয়েক দফা ভূমিকম্প হলে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতের উদ্যোগ নেয় সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। ওই সময় বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যমে নগরীর ২৫টি ভবনকে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ছিল সরকারি-বেসরকারি অফিস, বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন। চিহ্নিত ভবনগুলো ভেঙে ফেলার কথা বলা হলেও মাত্র দুটি ভবন ভেঙেই ওই উদ্যোগ থেমে যায়। ঝুঁকিপূর্ণ একাধিক বাণিজ্যিক ভবন ওই সময় সপ্তাহখানেকের জন্য বন্ধও রাখা হয়েছিল। পরে এসব ভবনে বড় ধরনের কোনো মেরামত কাজ না করেই শুধু নতুন রঙ লাগিয়ে আবার চালু করা হয়। ঝুঁকিকে রঙের আড়ালে ফেলে যা এখনো চলছে।

দুদিনে ঢাকাসহ সারা দেশে একাধিক ভূমিকম্পের পরিপ্রেক্ষিতে এবার সিলেটের চিহ্নিত ওই ভবনগুলো ফের ভাঙার কথা বলছে প্রশাসন। আগামী সপ্তাহেই শুরু হতে পারে এই অভিযান।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় ছয় বছর আগে সিলেট নগরীর ২৫টি ভবনকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওই সময় মাত্র দুটি ভবন ভাঙা হয়, অন্যগুলো এত বছর ঝুঁকিকে সঙ্গী করেই চলেছে। এবার আর চলতে দেওয়া হবে না। নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য ভবনগুলো জরুরি ভিত্তিতে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকেই ভাঙার কাজ শুরু হবে।

সিসিক সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে কয়েক দফা ভূমিকম্পের পর ঝুঁকি মোকাবিলায় বিপজ্জনক ভবন ভেঙে ফেলা, সব বহুতল ভবনের ভূমিকম্পনসহনীয়তা পরীক্ষার উদ্যোগ নেয় সিসিক। নগরীর প্রায় ৪২ হাজার বহুতল ভবন পরীক্ষার উদ্যোগ নিলেও অর্থসংকটে তা সম্ভব হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা করিয়ে ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ করে সিসিক। এর মধ্যে মাত্র দুটি ভবন অপসারণ হয়েছে। অন্যগুলো এখনো বহাল। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় নগরীর ছয়টি বিপণিবিতান রয়েছে। এগুলো হলো সুরমা মার্কেট, সিটি সুপার মার্কেট, মধুবন সুপার মার্কেট, সমবায় ভবন, মিতালী ম্যানশন ও রাজা ম্যানশন। ছয় বছর আগে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর এই মার্কেটগুলো কিছুদিন নোটিস টানিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল সিসিক। দুই সপ্তাহের মতো বন্ধ থাকার পর সেই যে চালু হয়েছিল মার্কেটগুলো, ঝুঁকি মাথায় নিয়ে আজও তা চলছে।

ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ভবনগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে সমবায় ব্যাংক ভবন মার্কেট, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার সাবেক কার্যালয়, দরগাগেটের আজমীর হোটেল, কালাশীল এলাকার মান্নান ভিউ, শেখঘাটের শুভেচ্ছা-২২৬ নম্বর ভবন, চৌকিদেখি এলাকার ৫১/৩ সরকার ভবন, যতরপুরের নবপুষ্প-২৬/এ, জিন্দাবাজার পুরানলেন এলাকার ৪/এ কিবরিয়া লজ, মিরাবাজার খারপাড়ার মিতালী-৭৪, মির্জাজাঙ্গালের মেঘনা-এ-৩৯/২, পাঠানটুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বাগবাড়ি এলাকার ওয়ারিছ মঞ্জিল একতা-৩৭৭/৭, হোসেইন মঞ্জিল একতা-৩৭৭/৮ ও শাহনাজ রিয়াজ ভিলা একতা-৩৭৭/৯, সুবিদবাজার বনকলাপাড়া এলাকার নূরানী-১৪, পীরমহল্লার লেচুবাগান এলাকার ৬২/বি প্রভাতী, শ্রীধরা হাউজ।

এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার বলেন, নগরীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বর্তমান অবস্থা খতিয়ে দেখা হবে। তাদের প্রয়োজনীয় সংস্কারের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তারা তা করেছেন কি না, পরীক্ষা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়ে একটি কমিটি রয়েছে। এই কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকেই এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভূতাত্ত্বিক কারণে সিলেট অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ। অতীতে এখানে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। আজ হোক কাল হোক আবার বড় ভূমিকম্প হতে পারে। তাই জানমালের ক্ষতি কমাতে সতর্কতামূলক প্রস্তুতি অপরিহার্য। এই প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভবনগুলো যতদূর সম্ভব ভূমিকম্প সহনীয় রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলা, উদ্ধারকাজের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির মজুদ রাখা, সড়কগুলো প্রশস্ত রাখা, যাতে উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব হয়।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে সিলেট নগরীতে যত ভবন রয়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি যথাযথ বিধিমালা মেনে নির্মিত হয়নি। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নজর দিতে হবে।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *