সহনশীলতা এমন এক মানবিক গুণ, যা মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে, সমাজকে স্থিতিশীল রাখে এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে মজবুত করে। সহনশীল মানুষ নিজের ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সংযম হারায় না। এই গুণই মানুষকে সত্যিকার অর্থে মানবিক করে তোলে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, সমাজজীবনে এই মহৎ গুণটি ক্রমে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সামান্য বিষয়েও মানুষ রাগে ফেটে পড়ে, অপরের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করে, এমনকি সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। ফলে সমাজে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা ও বিভাজন। অথচ সহনশীলতা শুধু নৈতিক গুণ নয়, এটি মানব সভ্যতার ভিত্তি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রধান শর্ত। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ইমানের অঙ্গ, ন্যায়ের অবলম্বন ও মানবতার পরিচায়ক। সহনশীলতার চর্চাই পারে মানুষকে উচ্চতর নৈতিক অবস্থানে পৌঁছে দিতে এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতির বীজ বপন করতে।
একজন মানুষ সহনশীল হবে, যদিও এটা স্বাভাবিক মানবিকতার দাবি। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক মানুষের ভেতর এই স্বাভাবিক মানবিকতার প্রচণ্ড অভাব। পথেঘাটে, দোকানে-বাজারে, গাড়িতে-বাড়িতে, অফিসে-আদালতে সব জায়গায় মানুষের আচার-ব্যবহারে মারাত্মক কঠোরতা, খুব অল্পতেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠা এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখানো ইত্যাদি সহনশীলতা ও সহ্যশক্তি না থাকার ঢের দৃষ্টান্ত এখন অহরহ চোখে পড়ে। এই যে মানুষ সহনশীল হয়ে থাকতে পারছে না, অল্পতেই কঠিন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তর্ক-ঝগড়া লেগে যাচ্ছে, অশ্লীল গালি দিচ্ছে, আক্রমণাত্মক কথার পর শরীরেও আক্রমণ করছে। এ সবের প্রতিফল কী হয়, তা কি মানুষ চিন্তা করে কখনো? এমন আক্রমণাত্মক স্বভাব-চরিত্র কেবল অরাজকতাই ডেকে আনে এবং পর্যায়ক্রমে বড় বড় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
প্রায় দেখা যায়, রাস্তায় হাঁটার সময় কোনো পথযাত্রীর পায়ে পা লাগলে সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে এবং ‘চোখে দেখতে পায় না’ বা এ জাতীয় তাচ্ছিল্যমূলক বাক্য বলে ফেলে। অপরজনও যদি আক্রমণাত্মক স্বভাবের হয় তাহলে তো একটা উচ্চপর্যায়ের বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। কখনো কখনো তা মারামারি পর্যন্তও নিয়ে যায়। অথচ শুরুতে দুঃখিত শব্দটি বলে দিলেই ঝামেলা শেষ হয়ে যেত। রিকশায় উঠলে অনেক সময় দেখা যায়, চলার সময় একটু পান থেকে চুন খসলেই দুই রিকশাচালকের মধ্যে কথার লড়াই শুরু হয়ে যায়। পর্যায়ক্রমে গালাগালি এবং হুমকি-ধমকির পর্ব তো থাকেই। যদিও সেগুলো মারামারি পর্যন্ত পৌঁছায় না। কিন্তু অযথা এই বাগ্যুদ্ধ একটি অরাজক পরিবেশ তৈরি করে। একদম শুরুতেই কথা না বাড়িয়ে যদি যার যার পথে চলে যেত তাহলে সেই উদ্ভট পরিস্থিতি তৈরি হতো না। কথা না বাড়িয়ে যে চলে যাবে, তাদের ভেতরে সহনশীলতার সেই শিক্ষাটা কোথায়? কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়।
স্রষ্টার সমগ্র সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। মানুষের মধ্যে সেরা হচ্ছেন নবী-রাসুলরা। আর তাদের সবার মধ্যে সেরা হচ্ছেন সৃষ্টিকুল শিরোমণি সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি আমাদের জন্য উত্তম জীবনাদর্শ। তার জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গ আমাদের জন্য আবশ্যিকভাবে অনুসরণীয়, অনুকরণীয়। তার প্রতিটি সুন্নাহ আমাদের জন্য আবশ্যিকভাবে পালনীয়। তা ছাড়া দুনিয়া ও আখেরাতে আমাদের মুক্তি নেই। তার উত্তম চারিত্রিক গুণাবলির একটি হলো সহনশীলতা। তার জীবন, কর্ম ও আদর্শে সহনশীলতার যে মহান শিক্ষা রয়েছে তা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে গোটা পৃথিবীর মানুষের জন্যই এক অনুপ্রেরণার উৎস। তাকে ঘোষণাই করা হয়েছে সমগ্র সৃষ্টির জন্য করুণার প্রতীক হিসেবে। জগদ্বাসীর জন্য তার আবির্ভাবই হয়েছে আশীর্বাদ হিসেবে। তিনি সৃষ্টির প্রতি কতটা সহনশীল, এ থেকেই তা অনুমেয়। তার কীর্তিময় জীবনের বাঁকে বাঁকে অজস্র ঘটনা রয়েছে, যে সবের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তাকে বিশ্বমানবতার পরম সুহৃদ ও সৃষ্ট জীবের প্রতি অতিশয় সহনশীল হিসেবে দেখতে পাই।
অমুসলিম মেহমানের সেবা, আগত মেহমান কর্র্তৃক অসদাচরণ করার পরও তার প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠা, মদিনার মসজিদে প্রস্রাব করে দেওয়ার পরও অমুসলিম ব্যক্তির প্রতি হজরত রাসুল (সা.)-এর সহনশীলতা প্রদর্শন, মক্কা বিজয়ের পর অমুসলিম নাগরিকদের বিষয়ে হজরত রাসুল (সা.)-এর সাধারণ ক্ষমার নির্দেশনা, তায়েফের ঘটনায় পাথর-বৃষ্টিতে রক্তাক্ত হওয়ার পরও তাদের জন্য প্রার্থনা, অত্যাচারী মানুষদের ধ্বংস করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েও তাদের প্রতি রহমশীল হওয়া, শিরেদ করতে আসা ব্যক্তিকেও প্রাণভিক্ষা দেওয়া, প্রিয় চাচা হামজার কলিজা চিবিয়ে খাওয়া বর্বর হিন্দাকেও ক্ষমা করে দেওয়া, বিষপ্রয়োগে হত্যা করতে চাওয়া ব্যক্তির প্রতি উদারতা প্রদর্শন ইত্যাদি অসংখ্য ঘটনায় তিনি যে সহনশীলতার অবিশ্বাস্য নজির স্থাপন করেছেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে তা বিরল। ইসলাম মানুষকে সহনশীল হতে এবং অন্যকে ক্ষমা করতে শেখায়। যারা কথায় ও কাজে সহনশীলতা প্রকাশ করে, মহান আল্লাহ তাদের জন্য রেখেছেন অনেক বড় পুরস্কার ও প্রতিদান। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই সহনশীলদের প্রতিদান পূর্ণভাবে দেওয়া হবে।’ (সুরা জুমার ১০)
মানুষের জীবন বিভিন্ন অবস্থার সম্মুখীন হয়। কখনো সুখের সম্মুখীন হয়, কখনো দুঃখ-কষ্টের মুখোমুখি হয়, কখনো ভালো কাজের সঙ্গে জড়িত হয়, কখনো পাপে নিমজ্জিত হয়। এসব অবস্থায় মানুষকে চরম সংযম ও সহনশীলতা অবলম্বনের জন্য ইসলাম জোরালো তাগিদ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা সহনশীলতা ও নামাজের মাধ্যমে আমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, নিশ্চয় আল্লাহ সহনশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা ১৫৩)
সংযম ও সহনশীলতা জান্নাতের পথকে সুগম করে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সুখ-দুঃখে, বিপদ-আপদে, সংঘাত-সংঘর্ষে, দ্বন্দ্ব-কলহে, ঝগড়া-ফ্যাসাদে সর্বাবস্থায় সংযম ও সহনশীলতা অবলম্বন করা উচিত। সহনশীলতা ও ক্ষমা মুসলমানের ইমানের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। হজরত রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইমান কী? তিনি বললেন, ‘ইমান হচ্ছে ধৈর্য ও সহনশীলতা।’
যদিও সব সময় সংযত হওয়া কঠিন এবং কষ্টসাধ্য কাজ, তবু এটি এমন এক মহৎ মানবিক গুণ, যা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণের জন্য খুবই প্রয়োজন। দুনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহনশীলতা ও সংযমের বিকল্প নেই। এ জন্যই ইসলাম ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়সহ সব ক্ষেত্রে সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোনের মধ্যে সহনশীলতা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতামত ও চিন্তার ক্ষেত্রে সহনশীলতা, অন্যান্য ধর্মের মানুষের আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক, সংলাপ ও সহযোগিতার মধ্যে সহনশীলতার দীক্ষা দেয়।
সহনশীলতা ইসলামের একটি মৌলিক নীতি এবং ধর্মীয় নৈতিক কর্তব্য। এর মানে এই নয় যে, ইসলাম কোনো অন্যায়ের ব্যাপারে ছাড় দেয়। ইসলাম সবসময়ই সহনশীলতার নির্দেশ দেয়। তবে অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন এবং অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ছাড় দেয় না। বরং এমন সময় সহনশীলতার প্রাচীর ভেঙে প্রতিবাদী হতে বলে।
সহনশীলতার গুণ মানুষকে আত্মিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। সহনশীল মানুষ জানে, রাগ বা প্রতিশোধ নয়, বরং সহনশীলতাই আসল বিজয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত জীবনে নয়, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে স্থিতি আনে, ভালোবাসা বাড়ায় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ গড়ে তোলে। যে সমাজে মানুষ একে অপরের ভুল ক্ষমা করতে শেখে, মতভেদে সংযম দেখায়, সেখানে অশান্তি ও বৈরিতা জায়গা পায় না। তাই সহনশীলতা কেবল নৈতিক শিক্ষা নয়, এটি মানবজীবনের অপরিহার্য অনুশাসন। এই গুণের চর্চা যত বাড়বে, ততই সমাজ আলোকিত হবে মানবিকতা ও শান্তির দীপ্তিতে।
লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার
