সরকারি মালিকানাধীন জলাশয় টেন্ডার বা নিলামের মাধ্যমে বরাদ্দ করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকারি জলাশয়ের জন্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বা নিলামে অংশ নিতে পারবেন ব্যক্তিগত ব্যক্তি, উদ্যোক্তা, মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, ফিশ প্রোডাকশন গ্রুপ এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। এই সিদ্ধান্তে রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জীবিকা ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
১৮ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ ভূমি ও ভূমি সংস্কার ম্যানুয়াল, ১৯৯১–এ আনা সংশোধনী অনুযায়ী, সরকারি জলাশয় আর শুধু সমবায় সমিতির মাধ্যমে নয়, বরং টেন্ডার বা নিলামের মাধ্যমে বরাদ্দ করা হবে। যদিও বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি, ফিশ প্রোডাকশন গ্রুপ ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি দরপত্রে মূল্যছাড় এবং আর্নেস্ট মানি ডিপোজিটে বিশেষ ছাড় পাবে, তবু বাস্তবে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন মৎস্যজীবীরা।
মৎস্যজীবী সমবায়গুলির দাবি, এই সিদ্ধান্তে প্রায় ১৭ লক্ষ নিবন্ধিত মৎস্যজীবী, যাঁরা রাজ্যের ৮০০-র বেশি সমবায় সমিতির সঙ্গে যুক্ত, সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ইতিমধ্যেই চারটি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি রাজ্য সরকারকে চিঠি দিয়ে এই বিজ্ঞপ্তি অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, আর্থিক ক্ষমতা থাকলেও যাঁদের সুস্থায়ী মৎস্যচাষের অভিজ্ঞতা নেই, তাঁরা জলাশয়ের দখল পেলে উৎপাদন ও পরিবেশ—দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আশঙ্কা পরিবেশবিদদেরও
পরিবেশবিদদের একাংশও এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, নিলামের মাধ্যমে জলাশয় বরাদ্দ হলে জলাভূমিতে বেআইনি দখল, অতিরিক্ত বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। জলাশয় সংরক্ষণ ও পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থাকা মৎস্যজীবী সমবায়গুলিই প্রকৃত অর্থে এই জলভূমির ‘স্বাভাবিক রক্ষক’ বলে তাঁদের মত।
মৎস্যজীবী সমবায়গুলির অভিযোগ, এই বিজ্ঞপ্তি বিদ্যমান একাধিক আইন ও নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির উন্নয়ন সংক্রান্ত নীতি, সংবিধানের মৌলিক অধিকার এবং রাজ্যের মৎস্যনীতি—সব কিছুর সঙ্গেই এই সিদ্ধান্তের বিরোধ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, পরিবেশ ও ঐতিহ্যবাহী জীবিকা রক্ষার স্বার্থে এই বিজ্ঞপ্তি বাতিল করা হোক।
সব মিলিয়ে, আধুনিকীকরণ ও স্বচ্ছতার যুক্তির বিপরীতে জীবিকা, পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন তুলে রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে আগামী দিনে আরও বড় বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলেই মনে করছে প্রশাসনিক ও পরিবেশ মহল।
আরও পড়ুন: বীরভূমের আদিবাসী গ্রামে ‘জীবন্ত ঈশ্বরের আরাধনা’য় গড়িয়া সহমর্মী সোসাইটি
