ছবির উৎস, Saffronart
উনিশ শতকের একটি ভারতীয় চিত্রকর্ম নিলামে বিক্রির সময় দামের নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। ‘যশোদা ও কৃষ্ণ’ নামের এই পেইন্টিং বিক্রি হয়েছে এক কোটি ৭৯ লাখ ডলার বা ১৬৭ কোটি রুপিতে।
উনিশ শতকের একটি ভারতীয় চিত্রকর্ম নিলামে বিক্রির সময় দামের নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। ‘যশোদা ও কৃষ্ণ’ নামের এই পেইন্টিং বিক্রি হয়েছে এক কোটি ৭৯ লাখ ডলার বা ১৬৭ কোটি রুপিতে।
ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে কোনো চিত্রকর্মের সর্বোচ্চ দাম বিবেচনা করা হচ্ছে এটিকে। চিত্রশিল্পী রাজা রবি ভার্মা ছবিটি এঁকেছিলেন।
দিল্লির স্যাফ্রনআর্ট-এ নিলামে ওঠে ছবিটি। এর দাম গতবছরের এম এফ হোসেনের চিত্রকর্ম “গ্রাম ইয়াত্রা”-র সর্বোচ্চ দামের রেকর্ডকে পেছনে ফেলেছে। ওই ছবিটির দাম উঠেছিল এক কোটি ৩৮ লাখ ডলার।
এত উচ্চমূল্যে এসব ছবি বিক্রি বা নতুন নতুন রেকর্ড তৈরির পেছনে ভারতীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রকর্মের চাহিদা বাড়তে থাকাও একটি কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
১৮৪৮ সালে দক্ষিণ ভারতের কেরালায় জন্ম নেওয়া চিত্রশিল্পী রবি ভার্মাকে আধুনিক ভারতীয় চিত্রকর্মের পথিকৃৎ এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী চিত্রশিল্পী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চিত্রকর্মটি কিনেছেন সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিলিওনেয়ার ব্যবসায়ী সাইরাস পুনাওয়ালা। সিরাম ইনস্টিটিউট বিশ্বের প্রধান টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম।
স্যাফ্রনআর্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পুনাওয়ালা বলেন, এই চিত্রকর্মটি একটি “জাতীয় সম্পদ” এবং এটি “জনসাধারণের দেখার জন্য সময়ে সময়ে এটি প্রদর্শনীতে তোলা উচিত”।
চিত্রকর্মটি মানুষের দেখার সুযোগ করে তার আন্তরিক চেষ্টা থাকবে বলেও জানিয়েছেন পুনাওয়ালা।
ভারতের পুরাকীর্তি ও শিল্প সম্পদ আইন অনুসারে ভার্মার চিত্রকর্মগুলোকে “শিল্প সম্পদ”-বলে অভিহিত করা হয়েছে, যার অর্থ এই চিত্রকর্মগুলো বাইরের কোনো দেশে রপ্তানি করা যাবে না এবং শুধু ভারতীয় বিক্রেতাদের কাছেই বিক্রিযোগ্য।
ছবির উৎস, Getty Images
স্যাফ্রন আর্টের প্রেসিডেন্ট ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা মিনাল ভাজিরানি ছবিটির এত দামে বিক্রি হওয়ার বিষয়ে বলেন, এটি “ভারতীয় সংস্কৃতির স্থায়ীত্ব ও এর চিত্রকলার প্রতি মানুষের আবেগকে শক্তিশালীভাবে ফুটিয়ে তোলে”।
ড্যাগ, আগে যেটি দিল্লি আর্ট গ্যালারি নামে পরিচিত ছিল, এর সিইও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিস আনন্দ বলেন, “শিল্পবাজারে এ ধরনের রেকর্ড দামে বিক্রির প্রভাব ভারতীয় চিত্রকর্মকে শুধু নান্দনিক এবং ব্যক্তিগত আনন্দের বাইরেও অর্থনৈতিক সম্পদেও পরিণত করছে।”
স্যাফ্রনআর্ট-এর ক্যাটালগ অনুযায়ী, চিত্রকর্মটি একজন ব্যক্তিগত সংগ্রাহকের মাধ্যমে নিলামে তোলা হয়েছিল।
ভার্মার কাজগুলোয় হিন্দু মহাকাব্য এবং পুরাণের বিভিন্ন ধারণা বাস্তব হয়ে ফুটে ওঠে যা ভারতে ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং এতটাই সমাদৃত যে ভারতের বাসাবাড়ির পূজার ঘরেও এর দেখা মেলে।
চিত্রকর্মে দেখা যায়, যশোদা দুধ দোয়াচ্ছেন এবং পাশেই কৃষ্ণ একটি পাত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কৃষ্ণের মুখে একটি দুষ্টুমিভরা চাহনি থাকলেও মা যশোদার চেহারায় দেখা যায় আন্তরিকতা। তাদের অলংকার অল্প হলেও তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে খুব সূক্ষ্মভাবে।
রাজা রবি ভার্মা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন যারা ভার্মার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করেন, তারা নিলামের আগে ইন্সটাগ্রামে একটি পোস্টে লেখেন, “ভার্মার গুণ এই ভারসাম্যের মাঝেই নিহিত, যিনি পবিত্রকে পরিচিতের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন।”
“রেশমের বুনন, গয়নার ঝলক, ত্বকের কোমলতা এবং গরুর স্থিরতার যে চিত্র এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা একইসাথে ভক্তিমূলক এবং অন্তরঙ্গ”- বলা হয় ওই পোস্টে।
ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
কৃষ্ণ ও যশোদার এই চিত্র বহুদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পীদের অনুপ্রানিত করে আসছে যা তারা গান, মন্দিরের দেয়ালে এবং স্থানীয় চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে ইতিহাসবিদদের মতে ভার্মা আরো জীবন্ত উপায়ে উপস্থাপন করেছেন কৃষ্ণ ও যশোদাকে।
শিল্পী এ রামচন্দ্র লেখেন, “সাধারণত যেখানে ঈশ্বরের আইকনোগ্রাফিক চিত্রগূলো শুধু ভক্তির সৃষ্টি করে, স্নেহ বা ভালোবাসা নয়, সেখানে ভার্মা এই ধারণা পাল্টে দিয়েছেন কৃষ্ণ এবং দর্শকদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে এনে।”
এ রেকর্ড বিক্রি আরো তুলে ধরেছে যে সংগ্রাহকেরা এখন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বসম্পন্ন ভারতীয় শিল্পের প্রতি বেশি মূল্য দিতে আগ্রহী।
আশিস আনন্দ বিবিসিকে বলেন, ভারতীয় শিল্পকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি পরিবর্তন এসেছে তা স্পষ্ট।
তিনি বলেন, “বাজার পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং মানদণ্ড বাড়ার ফলে সংগ্রাহকেরা এর সাংস্কৃতিক ও আর্থিক মূল্য উভয়ই উপলব্ধি করছেন।”
তিনি আরও যোগ করেন যে মূলত গুণগত মানই এই অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাজারের একচেটিয়া প্রভাবও দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
ভার্মা, অমৃতা শেরগিল ও ভিএস গাইতোন্ডের মতো শিল্পিদের অনেক মাস্টারপিস হয় কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে, অথবা চড়াদামে নিলামে উঠছে।
আনন্দ বলেন, বৈশ্বিক বাজারের পুরাণভিত্তিক চিত্রকর্মগুলোর চাহিদার স্বীকৃতি বাড়ছে।
