ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পর এবার নতুন লড়াই বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে আজ থেকে শুরু হচ্ছে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ এবারও জয় চাইবে, কিন্তু অধিনায়ক লিটন দাসের লক্ষ্য শুধু জয় নয় নিজেদের কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলা। বিশ্বকাপের আগে এমন চ্যালেঞ্জই যে উপকারে আসবে, সে ব্যাপারে পরিষ্কার তার ভাবনা।
বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের হাতে রয়েছে মাত্র দুটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই সিরিজ, আর নভেম্বরে একই ভেন্যুতে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আরেকটি। এর পরই ফেব্রুয়ারি-মার্চে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় বসবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসর। তাই এই ৬টি ম্যাচই লিটনদের প্রস্তুতির শেষ সুযোগ। সেই প্রস্তুতি যেন হয় বাস্তব পরীক্ষার মতো এই চাওয়াই তার।
ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফেরা অধিনায়ক লিটন দাস গতকাল চট্টগ্রামে সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ‘বিশ্বকাপের আগে আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। এই দুই সিরিজেই আমি চাই, আমাদের খেলোয়াড়রা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়–ক সেটা ব্যাটিংয়ে হোক, বোলিংয়ে হোক। আমি চাই আমরা যেন ব্যাকফুটে থেকেও লড়াই করি। চাপে থাকলে কীভাবে সামলাতে হয়, সেটাই এখান থেকে শিখে নিতে হবে।’
প্রস্তুতির মঞ্চ হিসেবে তাই সহায়ক উইকেট নয়, বরং ব্যাট-বল দুপক্ষের জন্যই চ্যালেঞ্জিং কন্ডিশন দেখতে চান লিটন। তবে ভালো উইকেটে খেলার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। ‘ভালো উইকেটে খেললে ব্যাটসম্যানদের সফল হওয়ার সুযোগ থাকে বেশি। এখনকার ব্যাটাররা বড় ছয় মারতে পারে। তবে শুধু ছয়ের ক্রিকেট নয় স্মার্ট ক্রিকেট খেলতে হবে। কখন ছক্কা মারতে হবে, আর কখন এক-দুই রান নিতে হবে এই ভারসাম্যই গুরুত্বপূর্ণ’ বলেন তিনি। গত মে মাসে পূর্ণকালীন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হওয়ার পর শুরুটা সুখকর ছিল না লিটনের। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে সিরিজ হারের পর পাকিস্তানের কাছে ধবল ধোলাই। তবে এরপর ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। টানা চারটি সিরিজে জয় শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেদারল্যান্ডস ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে। এশিয়া কাপে ব্যর্থ হলেও দলটি ছিল প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও আত্মবিশ্বাসী টাইগাররা।
টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের বদলে যাওয়া চেহারাটা চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ সালেই দলটি গড়েছে নিজেদের ইতিহাসে এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বাধিক ছক্কা মারার রেকর্ড। তানজিদ হাসান (৩০), পারভেজ হোসেন ইমন (২৮) আর সাইফ হাসান (২৪) এই তিন ব্যাটারই রেকর্ড গড়েছেন এ বছর। শুধু ছক্কা নয়, ব্যাটারদের স্ট্রাইক রেটও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। মানে, বাংলাদেশ এখন আগ্রাসী ক্রিকেট খেলতে জানে। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ চলছে উল্টো পথে। একসময় টি-টোয়েন্টির রাজা বলা হতো তাদের, কিন্তু গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের পর টানা আটটি সিরিজে হেরেছে ক্যারিবীয়রা। গত ডিসেম্বরে ঘরের মাঠেই বাংলাদেশের কাছে ধবল ধোলাই হয়েছিল। সাম্প্রতিক সিরিজে সহযোগী দেশ নেপালের কাছেও পরাজয়। সব মিলিয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এখন আত্মবিশ্বাসহীন, দলীয় ভারসাম্যও নেই আগের মতো।
বাংলাদেশের বিপক্ষে তাই চাপটা থাকছে ক্যারিবীয়দের ওপরই। তবে লিটনের বাংলাদেশ যে এবার নিজেদেরও চাপে ফেলতে চায়, সেটিই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। কারণ তিনি জানেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ চাপ সামলাতে না পারা। সেই প্রস্তুতি এখান থেকেই নিতে চান তিনি। লিটনের ভাষায়, ‘যখন আপনি চাপে থাকবেন, তখনই বোঝা যায় কে কতটা মানসিকভাবে শক্ত। আমি চাই, আমাদের বোলাররা কঠিন অবস্থায় বল করুক, ব্যাটাররা লড়াই করে রান করুক। এতে করে বিশ্বকাপে আমরা আরও আত্মবিশ্বাসী হব।’
চট্টগ্রামের উইকেট সাধারণত ব্যাটিংবান্ধব। তবে লিটনের ভাবনা ভিন্ন জয় নয়, প্রস্তুতিটাই মুখ্য। তাই ম্যাচ যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, ততই খুশি হবেন অধিনায়ক। একদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের হারানোর স্মৃতি ভুলতে চাইবে, অন্যদিকে বাংলাদেশ চায় নিজেদের চ্যালেঞ্জে ফেলতে।
ওদিকে টি-টোয়েন্টি সিরিজ নতুনভাবে শুরু করতে চায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অধিনায়ক শেই হোপ আশাবাদী মিরপুরের চেয়ে চট্টগ্রামের উইকেট ভিন্ন আচরণ করবে। উইকেট স্পিনবান্ধব হলেও ওয়ানডে সিরিজের শিক্ষা কাজে লাগাতে চাইবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ‘আমার দেখে তো ভালোই লাগছে। আপনি যদি দেখেন, খালি চোখে দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা ভালো। আর আমি বলব, যতবারই আমি চট্টগ্রামে আসি, ব্যাটার হিসেবে ব্যাট করার জন্য এটা বেশ ভালো পিচ। তাই আমি বলব এটা একটা ভালো উইকেট মনে হচ্ছে। কিন্তু আমি সবসময় যেমনটা বলি, মাঠে নেমে পরিস্থিতি বুঝতে হবে, দেখতে হবে ইনিংস যত এগোবে পিচটা কেমন আচরণ করবে।’ ‘যেচে নেওয়া চ্যালেঞ্জ’ কতটা ফলপ্রসূ হয় লিটন দাসের দলের জন্য। এখন সময়, সেই পরীক্ষায় মাঠে নামার।
