কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া এলাকা মানবপাচারের একটি গোপন ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। সমুদ্র ও পাহাড়বেষ্টিত এলাকাটি এখন মানবপাচারকারী ও দালালদের অভয়াশ্রম হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে, বিশেষ করে নারীদের বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় বাংলাদেশিরাও এ প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চক্রটির সদস্যরা প্রথমে চাকরি বা বিদেশে যাওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ‘শিকার’ নির্বাচন করে। তারপর নানা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাদের মালয়েশিয়া পাঠানো বা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নেওয়া হয় কচ্ছপিয়ায়। নিয়ে নেওয়া হয় তাদের মোবাইল ও পরিচয়পত্র। অমানবিক পরিবেশে আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা হয় মুক্তিপণ। যারা মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হয়, তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। যারা সামান্য অর্থ দিতে পারে, তাদের ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলারে তুলে গভীর সমুদ্রপথে পাঠানো হয়, যেখান থেকে অনেকেই জীবিত ফিরতে পারে না।
মানবপাচার প্রসঙ্গে বিজিবির টেকনাফ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান জানান, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সর্বদা সতর্ক রয়েছে। মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে বিজিবির ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে। মানবতা ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো পাচারকারী বা অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ ধরনের কঠোর অভিযান নিয়মিত চলবে, যাতে এই অপরাধমূলক কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা যায়।
তিনি আরও জানান, গত ১ জুন থেকে এ পর্যন্ত টেকনাফের কচ্ছপিয়া ও সীমান্তবর্তী এলাকায় একাধিক অভিযানে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি মিলিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১৭৭ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে বিজিবি। এ সময় ৩৬ জন মানবপাচারকারীকে আটক করা হয়েছে এবং টেকনাফ মডেল থানায় ৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা গেছে, ১ জুন থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কচ্ছপিয়া ও সীমান্তবর্তী এলাকায় একাধিক অভিযানে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি মিলিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৭২ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় দুজন মানবপাচারকারীকে আটক করা হয়েছে এবং টেকনাফ থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, টেকনাফের কচ্ছপিয়াসহ আশপাশের এলাকা মানবপাচারের গোপন ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের অভিযানে ছোটখাটো দালালরা ধরা পড়লেও, মানবপাচারের প্রকৃত মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে বেশ কয়েকজন মানবপাচারকারীর নাম উঠে এসেছে। তারা হলেনÑ কচ্ছপিয়া এলাকার সামসুর ছেলে রাসেল, নুর হোসেনের ছেলে কেফায়েত উল্লাহ, বাদশাহ মিয়ার ছেলে জসিম, মোহাম্মদ হোছনের ছেলে সুলতান আহমদ, ফজল আহমদের ছেলে জাফর আলম, মুজিব উল্লাহ, আয়াত উল্লাহ, গফুর মেম্বার, ছেবর, আব্দুস সালাম, আবদুল করিম, ছৈয়দুল হক, ফারুক, নোয়াখালীর নছরত আলীর ছেলে আবদুল আলী ও সাইফুল, আব্দুল আমিন, হাবির ছড়ার জাকির ও রাজারছড়ার মৌলভী হামিদ। তারা ছাড়াও সব মিলিয়ে অর্ধশতাধিক মানবপাচারকারীর ঘাঁটি ওই কচ্ছপিয়া।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের একটি অংশ ও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এ চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তা না হলে এতদিন ধরে একই এলাকায় বারবার একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়া সম্ভব হতো না।
মানবপাচারকারীদের আটকের বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার ওসি জায়েদ নুর জানান, পুলিশ অত্যন্ত তৎপর রয়েছে এবং অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে দায়েরকৃত মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। তদন্তে যেই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
