ছবির উৎস, Getty Images
পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা ভোট কোনো দলের কাছে ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই, কারো কাছে ‘কুরসি’ দখলের, আবার কারো কাছে ‘অস্তিত্ব রক্ষার’।
কে জিতবে আর কে দ্বিতীয় নম্বরে দৌড় শেষ করে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে- তা নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। যারা রাজনীতি নিয়ে চর্চা করেন তাদের প্রায়শই বলতে শোনা যায়, ভোটের অঙ্কে উত্তর মেলানো সব সময় সহজ নয়।
কারণ নির্বাচন কখনো ইস্যুভিত্তিক, কখনো প্রার্থী-নির্ভর আর কখনোবা একেবারে অন্য সমীকরণ কাজ করে।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
এদের কেউ এই ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, কেউ নিজে প্রার্থী নন, কেউ আবার এই রাজ্যের বাসিন্দাও না- কিন্তু নির্বাচনে কোনো না কোনোভাবে তারা উল্লেখযোগ্য ‘ফ্যাক্টর’।
কারা এই ব্যক্তি, কোন বিষয়গুলো তাদের পক্ষে যেতে পারে আর বিপক্ষেই বা কী যেতে পারে এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক।
ছবির উৎস, MAMATA BANERJEE/FACEBOOK
মমতা ব্যানার্জী
তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা ব্যানার্জীকে প্রায়শই বলতে শোনা যায় রাজ্যের ২৯৪টা বিধানসভা কেন্দ্রে ‘তিনিই প্রার্থী’। তার দলের নেতা নেত্রীরাও বলে থাকেন যে তিনিই ‘এক এবং অদ্বিতীয়’ নেত্রী।
সংসদীয় গণতন্ত্রে তার সফর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন মমতা ব্যানার্জী, সেই থেকে টানা ক্ষমতায় রয়েছেন তিনি।
গত কয়েক বছরে তার দলের নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। রাজ্যে বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দেখা গিয়েছে।
এই সমস্ত বিষয় মাথায় রেখে আসন্ন ভোটে লড়াই যে তার দলের জন্য খুব সহজ হবে না, এমনটা মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
- এগিয়ে থাকার ফ্যাক্টর-
মুখ্যমন্ত্রী নন, ‘দিদি’ বলেই নিজের পরিচয় সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে দীর্ঘদিন ধরেই সচেষ্ট তিনি। রাজ্যে নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তার কার্যকাল, জনসংযোগ, সংগ্রামী ভাবমূর্তি বরাবরই ভিন্ন ‘অ্যাপিল’ রেখেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে তিনি যে কঠোর অবস্থান নিতেও পিছপা হবে না তা বারবার জানান দিয়েছেন।
বিজেপির বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার তার দল। ভিন্ন রাজ্যে বাংলা বললেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা পেতে হচ্ছে, রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনার মতো ইস্যু নিয়ে ক্রমাগত প্রচার করেছেন তিনি।
এসআইআর নিয়ে যেমন বিজেপিকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি, তেমনই আইনজীবী হিসাবে দিল্লি ছুটেছেন রাজ্যের মানুষের ‘পক্ষে সওয়াল করতে’। তার এই ‘পরিত্রাতার’ ভূমিকা নিয়েও ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস দল।
আবার বিশেষজ্ঞদের মতে, লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্য সাথী এবং সম্প্রতি যুবসাথীর মতো প্রকল্প আসন্ন ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিগত নির্বাচনগুলোতে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের নেপথ্যে যে নারী এবং মুসলমান ভোটারদের একটা উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে তা মনে করেন অনেকে। এই দুই ফ্যাক্টর আসন্ন ভোটেও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
- অসুবিধায় ফেলতে পারে যেসব কারণ-
বিভিন্ন দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-মন্ত্রীদের নাম জড়িয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্র এবং পৌরসভায় নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতির মতো ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা-মন্ত্রী জেলেও গিয়েছিলেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির জেরে চাকরিহারারা বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন যা জাতীয় স্তরে শিরোনামে এসেছে।
অন্যদিকে, কলকাতা, দুর্গাপুর, ধূপগুড়িসহ, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় নারীদের যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যে তোলপাড় হয়েছে। আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্তে সরকারের ভূমিকা এবং রাজ্যে নারী সুরক্ষা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এই ইস্যুগুলো ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে যেতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। পাশাপাশি দুর্নীতিতে নাম জড়িয়েছে এমন নেতাদের দলে ফেরানো এবং প্রার্থী করা নিয়ে বিরোধীরা তাকে কোণঠাসা করেছেন।
ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ জুটি
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গকে ‘পাখির চোখ’ করেছে বিজেপি। ভোটের আগে বেশ কয়েকবার রাজ্যে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
আসন্ন বিধানসভা ভোটের ক্ষেত্রেও একই ছবি ধরা পড়েছে। বুথ স্তরের কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন হোক বা ভোটারদের মন জিততে ‘বাঙালি অস্মিতা’র সঙ্গে একাত্মতা – পশ্চিমবঙ্গ যে তাদের চোখে গুরুত্বপূর্ণ তা জনসাধারণকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তারা।
- সুবিধার দিকগুলো–
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মি. মোদীর ইমেজকে সামনে রেখে ভোটে লড়তে চাইছে বিজেপি যা বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। অন্যদিকে, অমিত শাহকে বিজেপির প্রধান নির্বাচনী কৌশলবিদ হিসেবে ধরা হয়।
বড় জনসভা এবং র্যালিতে কেন্দ্র সরকারের উন্নয়নের বার্তা তুলে ধরেছেন তারা আর তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে সেইসব সুবিধার বেশিরভাগই রাজ্যে পৌঁছাতে দেওয়া হচ্ছে না।
পাশাপাশি অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসকে নিশানা করে এসেছে বিজেপি। এই ভোটেও সেটাইকেই ‘অস্ত্র’ করেছেন তারা।
- অভিযোগ ও সমালোচনা –
গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভিত আগের থেকে শক্ত হলেও নরেন্দ্র মোদীকে সামনে রেখে রাজ্যে ভোটে জেতা কতটা সহজ তা দেখা দরকার। অন্যদিকে, এসআইআর এবং ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের নাম বাদ যাওয়া নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে।
বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মননের সঙ্গে বিজেপির ফারাক নিয়ে কটাক্ষ করতে দেখা গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস -সহ বিরোধীদের। বিজেপির বিরুদ্ধে ধর্মীয় মেরুকরণের অভিযোগও তুলেছে তারা।
ছবির উৎস, ABHISHEK BANERJEE
অভিষেক ব্যানার্জী
তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
বিধানসভা ভোটে তিনি দাঁড়াননি ঠিকই, কিন্তু এই নির্বাচনে তার গুরুত্ব তাতে একটুও কমে না।
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলে কান পাতলেই শোনা যায়, পার্টি স্ট্র্যাটেজি, সিদ্ধান্ত, প্রচার কৌশল থেকে শুরু করে তৃণমূল স্তরে সাংগঠনিক ভিত মজবুত করা-সব কিছুতেই তার ভূমিকা রয়েছে।
- অ্যাডভান্টেজ-
দলে পোড় খাওয়া নেতাদের ভিড়ে অভিষেক ব্যানার্জী একজন তরুণ মুখ যিনি সংসদীয় রাজনীতিতে ইতোমধ্যে সাফল্য পেয়েছেন। দলের সাংগঠনিক ভিত শক্ত করায় নজর দিয়েছেন তিনি।
তার ‘বয় নেক্সট ডোর’ ইমেজ জনসংযোগে সাহায্য করেছে। দলের একটা স্মার্ট, ঝকঝকে কেতাদুরস্ত ভাবমূর্তি তুলে ধরতেও সফল হয়েছেন।
অনেকেই তাকে ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে দেখেন।
- ডিসঅ্যাডভান্টেজ-
বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। তাছাড়া কংগ্রেসের মতোই তৃণমূল কংগ্রেসকে নিয়েও ‘পরিবারতন্ত্রের’ অভিযোগ উঠেছে ।
তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দলের সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হয়।
ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
শুভেন্দু অধিকারী
রাজ্যের বিরোধী দলনেতা হিসেবে সরব ভূমিকাতেই দেখা গিয়েছে একদা মমতা ব্যানার্জী ঘনিষ্ঠ, বর্তমানে বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে।
তাকে সামনে রেখেই নন্দীগ্রামে জিততে চাইছে বিজেপি। সেটা তার ঘরের মাঠ। আবার মমতা ব্যানার্জীকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও প্রার্থী হয়েছেন ভবানীপুর আসন থেকে।
রাজ্যে বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসার নেপথ্যে নন্দীগ্রাম এবং শুভেন্দু অধিকারী দুইয়েরই ভূমিকা রয়েছে।
- এগিয়ে থাকার ফ্যাক্টর-
পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থেকেই ২০২১ সালের বিধানসভার ভোটে মমতা ব্যানার্জীকে পরাজিত করেছিলেন তিনি।
গত কয়েক বছরে শক্তিশালী বিরোধী নেতা হিসাবে বিজেপির হয়ে তাকে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর ও সংলগ্ন জেলায় তার প্রভাব রয়েছে।
বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির অভিযোগ তুলেছেন। এই নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ব্যাপক প্রচারও করেছে।
এসআইআর-এর সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে নন্দীগ্রাম থেকে বাদ যাওয়া ভোটারদের বেশিরভাগই মুসলমান। এই বিষয়টাও পুরো রাজ্যে সার্বিকভাবে বিজেপির পক্ষে ‘অস্বস্তির’ কারণ হতে পারে।
ছবির উৎস, HUMAYUN KABIR/FACEBOOK
হুমায়ুন কবীর
ভোটের অঙ্কে সে অর্থে ‘কেন্দ্রীয় চরিত্র’ না হলেও হুমায়ুন কবীরের দিকে সকলের নজর রয়েছে।
একদা কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত হুমায়ুন কবীর সেই দল ছেড়ে বিজেপি এবং তারপরে তৃণমূল কংগ্রেস – তিনটি দলেই কোনো না কোনো সময় ছিলেন।
সম্প্রতি ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ নামে নিজের দল গড়েছেন। বিধানসভা ভোটের আগে বাবরি মসজিদের অনুকরণে মুর্শিদাবাদে মসজিদ তৈরির সিদ্ধান্ত এবং তার শিলান্যাসকে ঘিরে রাজনৈতিক ময়দানে আবার শোরগোল ফেলে দেন তিনি ।
আসন্ন ভোটে আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীনের সঙ্গে তার দলের জোট বেঁধেছে।
মুর্শিদাবাদের নওদা এবং রেজিনগর থেকে ভোটে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এই অঞ্চলে তার প্রভাব রয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে এখানকার মুসলমান ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। মোট ১৮২টা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তার দল যার মধ্যে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরও আছে।
- সমালোচনা-
একাধিকবার দল বদল এবং বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বহুবার সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। মুসলমান ভোট ‘কেটে’ অন্য দলকে ‘সুবিধা করিয়ে দেওয়ার’ অভিযোগ তুলেছে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস – দুই দলই।
ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images)
বিশেষজ্ঞদের মতামত
এই কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে প্রবীন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জী বলেছেন, “রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে মমতা ব্যানার্জীর গুরুত্ব রয়েছে। আবার মোদী এবং শাহ বিজেপির হর্তা-কর্তা। এই রাজ্যে বিজেপির আলাদা চেহারা নেই- আছেন বলতে নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ। নরেন্দ্র মোদীর নামে প্রচার হয় এবং অমিত শাহ প্রচার করান। পশ্চিমবঙ্গ দখল করতে তারা মরিয়া।”
শুভেন্দু অধিকারীর বিষয়ে তিনি বলেছেন, “উনি নিজে বিজেপি প্রডাক্ট নন, বরং বিজেপি তাকে অ্যাকুয়ার করেছে। দেখতে গেলে তার একমাত্র যোগ্যতা মমতা ব্যানার্জীকে নন্দীগ্রামে পরাজিত করা,” বলছিলেন মিজ. মুখার্জী।
তার কথায়, “অভিষেক ব্যানার্জী মমতার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। অনেক গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করেছে, সভা করছে, সাংগঠনিক কাজ করছে।”
অন্যদিকে, হুমায়ুন কবীরকে গুরুত্ব দিতে নারাজ তিনি। তার কথায়, “হুমায়ুন কবীরকে তেমন গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। কিছুদিন আগে তিনি বিজেপিতে ছিলেন, তারপর তৃণমূল কংগ্রেসে এবং আজ নিজের দল গড়েছেন। কাল কোথায় থাকবেন জানা নেই।”
নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ জুটির বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক উজ্জ্বল রায় বলেছেন, “এরা যখনই কোনো নির্বাচনে যান, তখন তার গুরুত্ব বেড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে তারা আগেও এসেছেন, কিন্তু ভোটে তা সাড়া ফেলেনি। এবার এসআইআর-কে কেন্দ্র করে বিজেপি অনেকটাই উৎসাহিত এবং তারা এখানে ভোটে সাফল্য পেতে চায়।।”
“তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় শক্তি মমতা ব্যানার্জী এবং তার লড়াকু ছবি। সঙ্গে অভিষেক ব্যানার্জীও আছেন। সাধারণত শাসকের ব্যর্থতাকে সামনে রেখেই বিরোধীরা ভোটে প্রচার করে।
“মনে রাখতে হবে মমতা ব্যানার্জীর সবচেয়ে বড় ক্যারিশমা বিরোধী-নেত্রী হিসেবে। এসআইআর-কে সামনে রেখে তিনি তার রাজনীতিকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন যে বিজেপিকে জবাব দিতে হচ্ছে। মজার বিষয় হলো এক শাসকদল আরেক শাসকদলকে প্রশ্ন করছে,” বলছিলেন মি. রায়।
তার মতে ভোটের অন্যান্য ইস্যুকে ছাপিয়ে আপাতত এসআইআর আলোচনার কেন্দ্রে। তিনি বলেছেন, “মানুষের বেসিক নিড রোটি, কপড়া, মকান ইত্যাদি এখন পেছনের সারিতে চলে গিয়েছে; সামনে এসেছে এসআইআর।”
“তৃণমূল কংগ্রেস বোঝাতে চাইছে- এসআইআর এর নাম করে সংখ্যালঘুদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। বিজেপি বোঝাতে চাইছে- অবৈধ ভোটারদের নাম বাদ গিয়েছে এবং এদের অনেকে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংক ছিল। কাজেই দুই পক্ষের রাজনৈতিক কৌশলই বেশ তীব্র।”
শুভেন্দু অধিকারীর গুরুত্বও ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, “শুভেন্দু অধিকারীর প্লাস পয়েন্ট হলো তার কেন্দ্র নন্দীগ্রাম এবং তিনি এমন একজন নেতা যিনি মুখ্যমন্ত্রীকে হারিয়েছেন। এবার তিনি নন্দীগ্রাম ছাড়াও ভবানীপুরে দাঁড়াচ্ছেন।”
“এর নেপথ্যে দুটো কারণ প্রথমত, নন্দীগ্রামে হারানোর পর তিনি এখন মমতা ব্যানার্জীর মাঠ মানে ভবানীপুরে এসে খেলছেন-এই বার্তা দেওয়া। আর দ্বিতীয়ত মুখ্যমন্ত্রীর রণকৌশল, ভোট মেশিনারিকে ভাঙার চেষ্টা করছেন তিনি। তার উদ্দেশ্য ভবানীপুরে যাতে মমতা ব্যানার্জীকে আরো বেশি সময় দিতে হয় এবং রাজ্যের অন্যান্য মাঠ যাতে ফাঁকা থাকে, আর বিজেপির খেলতে সুবিধা হয়।”
তার মতে হুমায়ুন কবীর বেশ ‘ইন্টারেস্টিং’ ভূমিকায় আছেন। উজ্জ্বল রায় বলেছেন, “তৃণমূল কংগ্রেস যেহেতু মুসলিম ভোট পায়, তাই হুমায়ুন কবীর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। তিনি নিজে দল তৈরি করেছেন, বোঝাতে চাইছেন তার দলই একমাত্র মুসলমানদের স্বার্থ নিয়ে ভাবে, আর তৃণমূল কংগ্রেস এতদিন তাদের ভোটের জন্য ব্যবহার করে এসেছে। তিনি বাবরি মসজিদের অনুকরণে মসজিদ তৈরির কথাও বলেছেন।”
“মজার বিষয় হলো তৃণমূল কংগ্রেস বলছে হুমায়ুন কবীর মুসলিম ভোট কাটার কারণে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছেন, আবার বিজেপি বলছে আসলে তিনি মমতা ব্যানার্জীকে ঘুরিয়ে সাহায্য করছেন। এতে খেলা আরো জমে গিয়েছে,” বলছিলেন মি. রায়।
