নিষ্ঠুর কিছু বাস্তবতায় সুখকর এবং স্বস্তিতে নির্বাচন হচ্ছে না, তা পরিষ্কার। তাও সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের টু ইন ওয়ান। সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে একই দিনে, একই সময়ে দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়া নিঃসন্দেহে, হিমালয় পর্বত হেঁটে পার হওয়ার মতো কঠিন কাজ। তবুও কিছু কিছু রাজনৈতিক দলকে সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকার গণভোট এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে, এক সঙ্গে করবে। তবু একটা দোলাচলে ছুটছে ভোটের গাড়ি। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেই এ গাড়িতে সওয়ারি হয়েছে অনেক বাড়ির যাত্রী। চলতি পথে এ যাত্রীরা আগুন দেখছে, লাশ দেখছে। খোলা চোখে দেখছে, আরও নানা বাধা-বিপত্তি। আবার ‘তবে-কিন্তু’ যোগ করে কমবেশি ভরসাও আছে। ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার রায়ের আগে কয়েকদিন এদিক-ওদিক সন্ত্রাসী হামলা চলেছে। তাতে রায় আটকায়নি। সামনে টার্গেটেড কিলিং মিশনের কু-খবর আছে। টার্গেট কিলিং হয়েছেও। সাহসীরা বলছেন, খুন-গুম অতিক্রম করেই জুলাইয়ের জন্ম হয়েছে। পালাতে হয়েছে ক্ষমতাধর শেখ হাসিনাকে। এরশাদের মতো শাসকও ক্ষমতাচ্যুতির পর দেশ থেকে পালাননি। কিন্তু, পরাক্রমশালী শেখ হাসিনাকে পালাতে হয়েছে। যিনি প্রায়ই বলতেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না’। চলমান ভায়োলেন্সের মূল টার্গেট, মানুষকে ভয়ে ফেলা। তা চলতে থাকলে, ভোটার উপস্থিতি কম হবে। কিন্তু এ দেশের তরুণ প্রজন্ম যে ভয়কে জয় করে একেকজন ওসমান হাদি হয়ে উঠেছে! এ আবেগের বিপরীতে দেশ জুড়ে সৃষ্ট সহিংসতা, নিষ্ঠুরতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি উদ্বেগকে গভীর করছে। আততায়ীর গুলিতে ঢাকায় আহত আসন্ন নির্বাচনের প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর আগে আরেকজন প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন চট্টগ্রামে। ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামের এক গার্মেন্টস শ্রমিককে কথিত ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বললে, বাস্তবতা অস্বীকার করা হবে। এগুলো নির্বাচনকে বানচাল করতে পারুক না পারুক, একটি বিভাজনমূলক পরিবেশ কিন্তু সৃষ্টি করেছে।

বিগত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার সরকার বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ, পারিবারিককরণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে দক্ষিণপন্থিদের উত্থান ঘটেছে। ভারতে অবস্থানকারী শেখ হাসিনা এবং তার সমর্থকদের দেশের স্বার্থবিরোধী অপতৎপরতাও চলছে। এতে নির্বাচন নিয়ে সংশয়-দোলাচল চলতে থাকাই স্বাভাবিক। নির্বাচন কমিশন তা নাকচ করে অভয় দিয়ে চলছে। নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিওত করে, এমন কর্মকাণ্ড ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাংবিধানিক এই সংস্থাটি থেকে বলা হয়েছে, যারা নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে চায়, তাদের প্রতি মানবিক হওয়ার দরকার নেই। সাম্প্রতিক সময়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে মাঠপর্যায়ে যৌথ বাহিনীকে অভিযান জোরদার করতে নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক থেকে কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাহিনীগুলো ইসিকে আশ্বস্ত করেছে যে, তারা একটি ভালো নির্বাচন করার জন্য বদ্ধপরিকর। তিন বাহিনীর প্রধানরা জানিয়েছেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা যা প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা তারা নিয়েছেন। ভোটের গাড়ির চলতি পথে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতির সঙ্গে, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের হুইসেল বেশ কড়া। অভিযোগে কেউ কাউকে ছাড়ছে না। তবে, হাদি হত্যা তাদের বোধগতভাবে কিছুটা ধাক্কা দিয়েছে। একটু-আধটু সাবধানিও করেছে। নির্বাচন বানচাল করতে হাদিকে টার্গেট কিলিং করা হয়েছে বলে অনেকের মধ্যে একটা অভিন্ন মত তৈরি হয়েছে। তবে, দায় যে যার দিকে পারছে ছুড়ছে। হাদির হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুণ্ঠনের ঘটনা সামনে আপদের বার্তাও দিচ্ছে। এর টার্গেট পয়েন্টে বিশেষত চব্বিশের বিপ্লবীরা। হাদির মৃত্যুর সময়ে ঢাকায় এনসিপির এক নেত্রীর ঝুলন্ত লাশ মিলেছে। বিভিন্ন জায়গায় কয়েক জুলাই যোদ্ধাকে বেদম মারের ঘটনাও রয়েছে।

ফ্যাসিবাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন ঐক্যবদ্ধ হওয়া তারুণ্যে বিভক্তি ভর করেছে। সেইসঙ্গে ভবিষ্যতে ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরশাসকের উত্থান যাতে না ঘটে, তা রুখে দেওয়ার জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রবণতা নেই অনেকের মধ্যে। যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন করতে করতে বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন, অতীতে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি, তাদের অনেকেই অতিদ্রুত নামের পেছনে যাতে ‘সংসদ-সদস্য’ পদ লিখতে পারেন, তার জন্য ভীষণ উতলা হয়ে উঠেছেন। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত মাত্র দুটি দেশে গণভোট এবং সাধারণ নির্বাচন একসঙ্গে হয়েছে। ১৯৪৫ সালে ইতালীয় গৃহযুদ্ধ এবং অক্ষশক্তি থেকে ইতালির মুক্তির পরের বছর রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপের ওপর একটি জনপ্রিয় গণভোট হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশটির ভোটাররা রাজতন্ত্রের পরিবর্তে প্রজাতন্ত্রের বিকল্প বেছে নেন। ১৯৪৬ সালে ইতালির গণপরিষদ নির্বাচনের জন্য, ইতালির সাধারণ নির্বাচন একই দিনে হয়েছে। ১৯৪৬ সালের ১০ জুন সুপ্রিম কোর্ট অব ক্যাসেশন ফলাফল ঘোষণা করে : ১২,৭১৭,৯২৩ জন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের পক্ষে এবং ১০,৭১৯,২৮৪ জন নাগরিক রাজতন্ত্রের পক্ষে। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ বেলিজে সাধারণ নির্বাচন এবং গণভোট একই দিনে হয়েছে।  সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল বেলিজের সংসদের জন্য। একই দিনে একটি সংবিধান-রেফারেন্ডামও হয়েছিল। প্রশ্ন ছিল : ‘বেলিজের সিনেট নির্বাচন করা হবে কি?’ রেফারেন্ডাম ছিল পরামর্শমূলক এবং তার প্রস্তাবটি অবলম্বন করা হয়নি, কারণ ভোটদানের হার ছিল কম। বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব এবং ঝুঁকি  ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলোর বিভক্তি নিয়ে। তাই ঘুরছে নির্বাচন হওয়া, হলেও সুষ্ঠু না হওয়াসহ নানা প্রশ্নের চক্কর। এখানে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের চাণক্যপুরীর বেপরোয়াপনাও বেশ প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ যে প্রশ্ন করতে শিখেছে, জবাব চাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে তা চরম অসহ্য ভারতের। প্রভুত্ব, বড়ত্ব আর আধিপত্য রোগে ‘বন্ধু’ নামের প্রতিবেশীটি কেবল বাংলাদেশের কাছে জবাব চায়। নিজে জবাব দেয় না, তার ওপর গণ্ডগোল পাকায়। গুজবের পর গুজবের গজব আরোপ করে। এ ধারাবাহিকতায় দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে রবিবার সন্ধ্যায় ফের বিক্ষোভ করেছে ভারতের উগ্রপন্থিরা। এর আগে শনিবার রাতেও ঘটিয়েছে একই কাণ্ড। বাংলাদেশ হাইকমিশনের অফিসের নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে ঢুকে ‘অখণ্ড- হিন্দু রাষ্ট্র সেনার’ ব্যানারে উৎপাত করেছে বিনা বাধায়। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকিও দিয়েছে। তারা বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে কথা বলছিল। এ সময় ‘হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে হবে’, ‘হাইকমিশনারকে ধর’ বলে সেøাগান দেওয়া হয়। বাংলাদেশ এর জবাব চেয়েছে। যথাযথ জবাব না পাওয়ায় আনুষ্ঠানিক উষ্মা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বরাতে দাবি করা হয়েছে, ‘একদল যুবক বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বাংলাদেশের ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের ঘটনার প্রতিবাদ করে সেøাগান দিয়েছে, কিন্তু বেষ্টনী ভেদ করা বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরির কোনো চেষ্টা ছিল না।

এ ধরনের একপেশে, খামখেয়ালি বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। ক্রমাগত খবরদারি ও আধিপত্য চালানোর জেরে বাংলাদেশে কিছুদিন ধরে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট মারাত্মক পর্যায়ে। এর অংশ হিসেবে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে মিছিলও ছুটেছিল। বাংলাদেশ সরকার তাদের নিবৃত করে সেটা সামলে নেওয়ার দক্ষতা দেখিয়েছে। ভারত সেটাকে ফলাও করেছে, নেতিবাচক ও অসত্যভাবে। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটে ভারতের হাইকমিশন অফিসে হামলার গুজবও রটিয়েছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে সে সব অফিসে বাড়তি নিরাপত্তা দিয়েছে বাংলাদেশ। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক মোতায়েন রেখেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ এবং তার সন্দেহভাজন হামলাকারীদের ভারতে চম্পট দেওয়ার খবরে ঢাকাসহ বাংলাদেশে মূলত ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্টে নতুন করে টোকা পড়ে। সরকার দ্রুত বিষয়টি আমলে নেয়। কোথাও যেন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটে, সেই ব্যবস্থা করে। তার উল্টোটা করে ভারত। বাংলাদেশকে কেবল দোষারোপ নয়, নানা গুজবও রটায়। তার ওপর দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মূল ফটকে ঢুকে হিন্দু চরমপন্থিরা  বিক্ষোভ করে। উসকানিমূলক স্লোগান, এমনকি হাইকমিশনারকে হুমকিও দেয়। কূটনৈতিক শিষ্টতায় এর প্রতিবাদ করে বাংলাদেশ। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের জন্য যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ করে। এটুকুই সহ্য হয়নি ভারতের।

ভারতের মদদে বাংলাদেশের ক্ষমতায় চেপে বসা ফ্যাসিবাদের ৫ আগস্টে পতনের পর থেকে ভারত যে আদাজল খেয়ে নেমেছে, তা থেকে একটুও পিছু হটেনি। বরং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দেশটির পত্রিকা-অনলাইন-টেলিভিশনগুলো হয়ে উঠেছে বাংলাদেশবিরোধী প্রোপাগান্ডা মেশিন। প্রতিনিয়ত ছড়াতে থাকে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য। অবশ্য সচেতনরা তাতে গা মাখতে চাচ্ছেন না। তাদের হিসাব পরিষ্কার যে, স্বভাব-চরিত্র ও বেদনা অনুযায়ী ভারতের এসব করা খুবই স্বাভাবিক। তাই তাদের গুজবে কান দেওয়া সময়ের অপচয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে বিস্তর ক্ষোভ। তাদের এ ক্ষোভকে আরও বাড়াতে চায় ভারত। চায় তারা ক্ষেপুক। উত্তেজিত হয়ে অঘটনে জড়াক। তা ভারতকে সুবিধা পাইয়ে দেবে। এখানে বুঝের মারাত্মক তফাৎ। ঠিক এভাবে বুঝে অভ্যস্ত নয়, সাধারণ মানুষ। সচেতনরা চান না, ভারতে বা অন্য কোনো দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কী করছে, সেটাকে উপলক্ষ করে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু মানুষের ক্ষতি হোক। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, তার দলের প্রায় সমগ্র নেতৃত্ব এবং সাবেক মন্ত্রী ও ভেঙে দেওয়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদের আওয়ামী লীগ দলীয় প্রায় সব সদস্য, সাবেক সরকারের আমলে সুবিধাভোগীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে ভারতের ইন্ধন এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় শেখ হাসিনা ও ভারতে আশ্রিত তার মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-াদেশ ভারতের জন্যও কষ্টের।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

[email protected]





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *