আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নিলে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে না বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড জানিয়েছেন বিসিবির ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান এম নাজমুল ইসলাম। গতকাল বুধবার বিসিবির আয়োজনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে অংশ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান নাজমুল।
৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অভিযান। কিন্তু ভারতে উগ্র হিন্দুপন্থিদের দাবির মুখে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার পর পাল্টে যায় পরিস্থিতি। নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কায় ভারতে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ, সরকারের সিদ্ধান্তের পর বিসিবিও আইসিসির সঙ্গে ভার্চুয়াল সভায় জানিয়ে দেয় ভারতের মাটিতে খেলতে না যাওয়ার কথা। অন্যদিকে আইসিসিও যুক্তি তুলে ধরেছে এত কম সময়ে ভেন্যু বদল করতে না পারার বাস্তবতা। এই টানাপড়েনে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে না খেলার আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে, সেই সঙ্গে নানান মাধ্যমে উড়ো খবর বিশ্বকাপে না গেলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে বিসিবি। তবে নাজমুল জানিয়েছেন, বিশ্বকাপে না খেললে খেলোয়াড়রা প্রাইজমানি, ম্যাচ ফি, ম্যাচসেরা কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত হবেন; তবে বিসিবির কোনো আর্থিক ক্ষতি হবে না। ২০২৩ সালে চূড়ান্তকৃত আইসিসির রাজস্ব বণ্টন নীতি অনুযায়ী ২০২৪-২০২৭ চক্রের সময়ে আইসিসির আহরণকৃত রাজস্বের যে অংশ বিসিবির পাওয়ার কথা ২৬.৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (মোট আয়ের ৪.৪৬ শতাংশ) বিসিবি সেটা পাবেই।’ ২০২৩ সালে আইসিসির শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৭ চক্রে আইসিসির মোট রাজস্ব ধরা হয়েছে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ভেতর সবচেয়ে বেশি ৩৮.৫০ শতাংশ নেবে ভারত, বাকি ১১ পূর্ণ সদস্য মিলে নেবে ৫০.৩১ শতাংশ। এরপর বাদবাকি ১১.১৯ শতাংশ পাবে আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশগুলো। এই হচ্ছে কালনেমির লঙ্কাভাগের হিসাব!
নাজমুল বলেছেন, বিশ্বকাপ না খেললেও আইসিসির রাজস্ব বিতরণ মডেল অনুযায়ী যা পাওনা, বিসিবি সেটাই পাবে, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কোনো ক্ষতি হবে না, ক্ষতিটা হবে ক্রিকেটারদের। কারণ হচ্ছে যে, ক্রিকেটাররা খেললে প্রতিটা খেলায় তারা এক ধরনের ম্যাচ ফি পায়, যদি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয় অথবা বিশেষ পারফরম্যান্সের কারণে যে পুরস্কারটা থাকে…ম্যাচের নিয়ম অনুযায়ী তারা যা পাওয়ার সেটা পায়। ওটা হচ্ছে এক্সাক্টলি প্লেয়ারের পাওনা। এটার সঙ্গে বোর্ডের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মানে বোর্ডের এখানে লাভ বা ক্ষতি কোনো কিছু নেই। অন্তত এই বিশ্বকাপের জন্য।’
বিসিবির ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান আরও জানান, ‘(২০) ২৭ সাল পর্যন্ত, আমাদের রাজস্বতে কোনো কিছু সমস্যা করবে না। কারণ, ২০২২ সালে (আসলে ২০২৩) আইসিসির যে ফাইন্যান্সিয়াল মিটিং হয়েছে, সেই মিটিংয়ে দ্যাট হ্যাজ অলরেডি বিন সেট। এর পরের কোনো বিশ্বকাপ বা এর পরের কোনো বাই-ল্যাটারাল সিরিজ বলি, ইন্টারন্যাশনাল ইয়ে বলি, সেগুলোর সঙ্গে এটার সম্পর্ক থাকতে পারে। সেগুলোর জন্য কারণ হচ্ছে, ধরেন একটা প্রশ্ন করতে পারেন যে, আমাদের পরবর্তী এফটিপি অনুযায়ী যে দলগুলো আমাদের দেশে আসার কথা তারা আসবে কি আসবে না? এটার অনেক অনেক মানে ইয়েস-নো ভেরি গুড প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু এতে এদের কিচ্ছু আসে যায় না।’
আইসিসি থেকে প্রাপ্য অর্থের হিসাবও বুঝিয়ে দিয়েছেন নাজমুল, ‘অনেকে ফাইন্যান্সিয়াল বিষয়গুলো নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা তৈরি করছে। একটা বিষয় হচ্ছে, এখানে দুইটা পার্ট। আমি এমনও শুনেছি আপনাদের ভেতরেই বিভিন্নভাবে
কথাবার্তা হচ্ছে যে আইসিসি থেকে আমরা ২৭ মিলিয়ন ডলার পাই। আইসিসি থেকে আমরা ২৭ মিলিয়ন ডলার পাই না। আইসিসি থেকে আমরা ২০.৪ মিলিয়ন ডলার পাই প্রতি বছর। ঠিক আছে? তারপরে হচ্ছে ৪ মিলিয়ন ডলারের একটা ওদের কাছে ইয়ে থাকে, একটা রিজার্ভ মানি থাকে। যেই রিজার্ভ মানিটা ওরা তিন-চার বছর পর পর কারও যদি কোনো ধরনের অ্যাডজাস্টমেন্ট থাকে, বিভিন্ন রকমের ইয়ে থাকে, ওটা পরে একসঙ্গে ওরা রিম্বার্স করে। এবং আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত ওটা না পাচ্ছি এটা শুধু আমাদের জন্য না, প্রতিটা কান্ট্রির জন্য এই এমাউন্টটা সেইম। এই ৪ মিলিয়ন, কেউ যদি ৩০ মিলিয়ন ডলার পেয়ে থাকে, তাহলে তার সঙ্গে আপনি ৪ মিলিয়ন ডলার যোগ করবেন। কেউ যদি ১০০ মিলিয়ন ডলার পেয়ে থাকে, তাহলে তার সঙ্গে ১০৪ মিলিয়ন যোগ করবেন। ওই ৪ মিলিয়ন ডলার সবসময় আইসিসির কাছে রিজার্ভ থেকে যায়। যেই রিজার্ভটা ওরা তিন-চার বছর পর পর একবার কারও সঙ্গে কোনো ধরনের লেনদেন আছে কি না ইয়ে আছে কি না সেগুলো অ্যাডজাস্ট করে তারা একসঙ্গে ওটাকে রিম্বার্স করে। দিস ইজ হোয়াট বিসিবি ইজ গেটিং ফ্রম আইসিসি।’ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য প্রিপারেশন মানি হিসেবে ৫০০,০০০ মার্কিন ডলার এরই মধ্যে বিসিবি পেয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন নাজমুল।
বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়া হলে খেলোয়াড়দের কোনো রকম ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও সম্ভাবনা নেই, জানিয়েছেন বিসিবি পরিচালক নাজমুল, ‘কেন? ওরা গিয়ে যদি কিছুই না করতে পারে, তাহলে ওদের পেছনে আমরা যে এত কোটি কোটি টাকা খরচ করছি, আমরা কি ওদের কাছ থেকে ওই টাকা ফেরত চাচ্ছি নাকি? চাচ্ছি এই প্রশ্নের উত্তর দেন আমাকে?’ প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে যেসব দলের খেলোয়াড়দের বসে থাকতে হচ্ছে বেশ কিছু দল অংশগ্রহণ না করায়, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া আর জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের না দেওয়া প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘তাদের বাস্তবতা আর ১ম বিভাগের বাস্তবতা তো এক না। জাতীয় দলে, কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা ক্রিকেটারদের বেতন আছে, চিকিৎসা ভাতা আছে, চোট পেলে বীমা যদি দেয় ১০ লাখ টাকা বিসিবি খরচ করে ১ কোটি টাকা, তাদের সঙ্গে ওদের (প্রথম বিভাগে বঞ্চিত) মেলানো এক হবে না।’
