বছরের শুরুটা বিদ্রোহে। শেষটা মাঠে। মাঝে ফুটেছে প্রাপ্তির ফুল। ২০২৫ সালটা দেশের নারী ফুটবলের কেমন কেটেছে? এমন প্রশ্নে চাইলে এক কথায় ওপরের উত্তরটা দেওয়া যায়। ঘটনাবহুল একটা বছর কাটিয়েছেন বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা। মাঠের ভেতর-বাইরে সমানভাবে আলোচনায় থেকেছেন তারা। তবে খেলোয়াড়দের ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন ব্রিটিশ কোচ পিটার জেমস বাটলার।
বিদ্রোহে উত্তল নারী ফুটবল : ২০২৫ সালের ব্যবচ্ছেদ করতে গেলে একটু পেছনে দৃষ্টিতে ফেরাতে হবে। ৩০ অক্টোবর ২০২৪। কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালায় নারী সাফের ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয় বাংলাদেশ। তবে এই সাফল্যের নেপথ্যে ঘটেছিল বড় ঘটনা। ব্রিটিশ কোচ বাটলারের সঙ্গে নানা কারণে সিনিয়র ফুটবলারদের তৈরি হয় দূরত্ব। টুর্নামেন্ট চলাবস্থায় তা প্রকাশ্যে এলেও এ বছর শুরুতে ঘটে বিস্ফোরণ।
দুই সাফজয়ী দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের নেতৃত্বে সিনিয়ররা বাটলারের অধীনে অনুশীলন না করার সিদ্ধান্ত নেন। ৩০ জানুয়ারি বাফুফে ভবনের নিচে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানানোর পাশাপাশি কোচের বিরুদ্ধে তোলেন নানা অভিযোগ। তাতেই সুখের ঘরে লাগে আগুন। এক সঙ্গে ১৮ ফুটবলারের বিদ্রোহে কেঁপে ওঠে ফুটবলাঙ্গন।
বাফুফের তখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি দশা। তবে অভিভাবক সংস্থা হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তারা পুরো বিষয়টি ছেড়ে দেয় সময়ের হাতে।
বাটলার দ্য বস : বিদ্রোহী ফুটবলারদের বাদ দিয়ে কোচ পিটার বাটলার গড়েন তারুণ্যনির্ভর দল। যে দল নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে তিনি যান সংযুক্ত আরব আমিরাতে, দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে। স্বাগতিকদের সঙ্গে দুই ম্যাচেই বাংলাদেশ হারে। সাবিনা, মাসুরা, মনিকা, মারিয়া, ঋতুপর্ণা, শিউলি, কৃষ্ণা, সানজিদা, শামসুন্নাহারদের বাদ দিয়ে যেখানে নারী ফুটবল কল্পনাই করা যায় না, সেখানে একরোখা বাটলার তারুণ্যে ভরসা করে দেশকে ডোবান চরম লজ্জায়। আমিরাত থেকে ফেরার পর বাটলার বিদ্রোহীদের থেকে ৯ জনকে ডাকেন ক্যাম্পে। তবে হিসাবের বাইরে রেখে দেন সাবিনা, মাসুরা, কৃষ্ণা, সানজিদা, মাতসুশিমা সুমাইয়াদের। ঋতুপর্ণা, রূপনা, মনিকা, মারিয়াসহ ৯ জনকে ফিরিয়ে বাটলার শুরু করেন এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্রস্তুতি। মে মাসে সেই দল নিয়ে জর্ডানে গিয়ে কুড়িয়ে নেন ভালো খেলার আত্মবিশ্বাস। র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা ইন্দোনেশিয়া ও স্বাগতিক জর্ডানের সঙ্গে ড্র করে বাংলাদেশ। সেই আত্মবিশ্বাস সঙ্গী করে দেশে ফিরে জুনের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ যায় মিয়ানমারে।
মিয়ানমারে ইতিহাস : সিনিয়রদের ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণে বাটলার চেয়েছেন দলের কাছ থেকে সেরাটা আদায় করতে। ২৯ জুন এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্রথম ম্যাচে বাহরাইনকে ৭-০ গোলে হারিয়ে শুরু। বাংলাদেশের এমন জয়ে নড়েচড়ে বসে গ্রুপ ফেভারিট স্বাগতিক মিয়ানমার। টানা পাঁচবার এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলা মিয়ানমারকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে দিনটি উপহার দেন ঋতুপর্ণা চাকমা। ২ জুলাই সেই ম্যাচে এই উইঙ্গার করেন জোড়া গোল। শেষ দিকে মিয়ানমার একটি গোল হজম করলেও সর্বনেশে হার এড়াতে পারেনি। মিয়ানমারকে হারানোর মধ্য দিয়েই বলতে গেলে অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল ইতিহাসে নাম লেখানো। তবে বাংলাদেশ শেষ ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। কারণ শেষ ম্যাচের প্রতিপক্ষ তুর্কমেনিস্তানও র্যাংকিংয়ে ছিল বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। তবে মধ্য এশিয়ার দলটিকে সামনে পেয়ে ফের জ্বলে ওঠে বাংলাদেশের মেয়েরা। ঋতু ও শামসুন্নাহার জুনিয়র করেন জোড়া গোল। একটি করে গোল করেন মনিকা, স্বপ্না ও তহুরা। ৭-০ গোলের জয়ে সি গ্রুপ সেরা হয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের এলিট মঞ্চে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ।
অনূর্ধ্ব-২০ দলও সেরার মঞ্চে : সিনিয়রদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলও পৌঁছে এশিয়ার সেরার মঞ্চে। আগস্টে লাওসে অনুষ্ঠিত বাছাইপর্বে বাংলাদেশ এইচ গ্রুপের দ্বিতীয় সেরা হিসেবে প্রথমবারের মতো পৌঁছে যায় মূল পর্বে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে থাইল্যান্ডে বসবে সে আসর। বাংলাদেশ বাছাইয়ে পূর্ব তিমুর ও লাওসকে হারায় তবে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে দ্বিতীয় হয়। আর গ্রুপের মধ্যে দ্বিতীয় সেরা হওয়া দলগুলোর মধ্য থেকে তিনটি সুযোগ পেয়েছে মূল পর্বে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ হয়েছে দ্বিতীয় সেরা। এই বাছাই খেলতে যাওয়ার আগে ঘরের মাঠে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ আসরের শিরোপা জেতে বাংলাদেশের মেয়েরা।
তারপরও সঙ্গী হতাশা : মিয়ানমার জয় করে ফেরা চাট্টখানি ব্যাপার ছিল না। এশিয়ার সেরা ১২ দলে নাম লেখানোর পর ঋতুপর্ণারা ভেসেছেন প্রশংসায়। কুড়িয়েছেন অনেক অনেক বাহবা। একুশে পদক, রোকেয়া পদকের মতো সম্মানের পাশাপাশি অর্থ পুরস্কারও জুটেছে কমবেশি। এরপর তো কেবল সামনেই তাকানোর কথা ছিল। তবে হয়নি সেটা। বাফুফে তাদের ঘিরে গড়েনি সেরা পরিকল্পনা। দেশে লিগ খেলার সুযোগ বঞ্চিত হয়ে দলে দলে ফুটবলাররা নাম লেখান ভুটান ওমেন্স লিগে। মানে-গুণে অনেক পিছিয়ে থাকা সেই লিগে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে আসা ফুটবলারদের ফিটনেসের অবস্থা হয় যাচ্ছেতাই। কথা ছিল জাপান গিয়ে অনুশীলন করবে বাংলাদেশ। সেখানে বেশ কিছু প্রস্তুতি ম্যাচও খেলার কথা ছিল। তবে হয়নি সেটা। জাপান সে সুযোগ দেয়নি বাংলাদেশকে। ভুটানে লিগে খেলাবস্থায় অক্টোবরে ডাক পড়ে সেই নয় ফুটবলারের। ঋতুরা ফিরে এসে দলের সঙ্গে যান থাইল্যান্ডে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে। দুই ম্যাচেই জুটে বাজেভাবে হারের অভিজ্ঞতা। থাইল্যান্ডের দুই ম্যাচে ঋতুদের ফিটনেস ও পারফরম্যান্সে যারপরনাই হতাশ হন কোচ বাটলার। আবার তার হাইলাইন ডিফেন্স তত্ত্বও বাংলাদেশকে দিশেহারা করে দেয়। একই অবস্থা দেখা যায় নভেম্বরে ঢাকায় ত্রিদেশীয় সিরিজে। তবে এবার ফিটনেস নিয়ে কোচের অভিযোগের সুযোগ ছিল না। বরং তার বিতর্কিত কৌশলে প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে হারতে হয় ১-০ ব্যবধানে। অথচ এই মালয়েশিয়াকেই দু’বছর আগে বাংলাদেশ হারিয়েছিল বড় ব্যবধানে। আর সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ হারে ইউরোপের দল আজারবাইজানের কাছে ২-১ ব্যবধানে। এ ম্যাচে অবশ্য বাংলাদেশের খেলা প্রশংসা পেয়েছে।
সাফ ক্লাব কাপে নাসরিনের লজ্জা : ৫ ডিসেম্বর নেপালের কাঠমান্ডুতে শুরু হয়েছিল প্রথম সাফ ওমেন্স ক্লাব কাপ চ্যাম্পিয়নশিপ। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিল ২০২৪ লিগ চ্যাম্পিয়ন নাসরিন স্পোর্টিং অ্যাকাডেমি। পাঁচ দলের সেই আসরে নাসরিন শেষ করেছে সবার নিচে থেকে। একটি ম্যাচও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। অথচ কাঠমান্ডুতে আরেকটা ইতিহাস গড়তে পারতেন বাংলাদেশের মেয়েরা। সেটা হয়নি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অবহেলা, পিটার বাটলারের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও নাসরিনের কর্তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতায়।
সাবিনাদের অন্যরকম ফেরা : সাফ জয়ের পর থেকে বন্ধ জাতীয় দলের দরজা। ভুটানে বড় একটা সময় লিগ খেলে দেশে ফিরে অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাটছিল সাবিনা, মাসুরা, কৃষ্ণাদের সময়। বাটলার, বাফুফে ও নাসরিনের সিদ্ধান্তে সাফ ক্লাব কাপেও খেলার সুযোগ পাননি। তবে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে বাফুফে তাদের দিয়েছে সুখবর। জানুয়ারিতে থাইল্যান্ডে হতে যাওয়া প্রথম সাফ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ডাকা হয় সিনিয়রদের। ৩০ নভেম্বর ট্রায়ালে যোগ দেন বেশ ক’জন সিনিয়র। ইতিমধ্যে ইরানি কোচের অধীনে চলছে তাদের জোড় প্রস্তুতি। এতদিন অনিশ্চিত সময় কাটানো সাবিনারা ফিরেছেন অন্যরূপে।
শেষে এসে লিগ খেলার সুযোগ : ফুটসাল খেলবেন বলে সাবিনারা হারাচ্ছেন ২৯ ডিসেম্বর শুরু হতে যাওয়া ১১ দলের ওমেন্স লিগ খেলার সুযোগ। হ্যাঁ, বছরের একেবারে শেষভাগে এসে নামকাওয়াস্তেএকটা লিগ আয়োজন করতে যাচ্ছে বাফুফে। যেখানে খেলার সুযোগ পাবেন এশিয়ান কাপের ক্যাম্পে থাকা জাতীয় দলের ফুটবলাররা। এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার শর্তপূরণে লিগে এক দলকে নিদেনপক্ষে ১০টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেতে হবে। তাই তড়িঘড়ি দল বাড়িয়ে লিগ হবে ১১ দল নিয়ে। গতকাল শেষ হয়েছে লিগের দলবদল। আগের সাত দলের সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে চারটি দল। এই লিগ খেলেই ঋতুপর্ণারা শুরু করবেন আগামী বছর মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় হতে যাওয়া এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতি।
