একদিকে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত চলছে, অন্যদিকে সে উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তানের চিরশত্রু ভারত সফরে এসেছেন আফগানিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী নুরুদ্দিন আজিজি। গতকাল বুধবার নয়াদিল্লি পৌঁছান তিনি। ভারতের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৫ দিনের সফরে নয়াদিল্লি আসছেন আফগানিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী। ভারত ও আফগানিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের আওতা আরও বৃদ্ধি করা এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা এ সফরের প্রধান উদ্দেশ্য। ভারতীয় সূত্রে জানা গেছে, এ সফরে ভারতের বাণিজ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন নুরুদ্দিন। সেই সঙ্গে দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফেয়ারেও (আইআইটিএফ) অংশ নেবেন তিনি। প্রসঙ্গত, আফগান পণ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার ভারত। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আফগানিস্তান থেকে যেসব পণ্য ভারত আমদানি করেছে, সেগুলো হলো ডুমুর, হিং (এক প্রকার মসলা), কিশমিশ, আপেল, রসুন, জাফরান, মৌরি, অ্যালমন্ড বাদাম, অ্যাপ্রিকট (একপ্রকার ফল), পেঁয়াজ, বেদানা এবং কাঠবাদাম। তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারত-আফগানিস্তান বাণিজ্য কাবুলের পক্ষে ঝুঁকে গেছে ভারত থেকে আমদানি কমেছে, আর আফগানিস্তান থেকে রপ্তানি বেড়েছে। বর্তমানে ভারত আফগানিস্তানে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে, তার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য আমদানি করে।
গত বহু দশক ধরে আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার ছিল পাকিস্তান। প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের বাৎসরিক বাণিজ্যের ভলিউম ১৭০ কোটি ডলারেরও বেশি। এই কিছুদিন আগ পর্যন্তও পাকিস্তান থেকে নিয়মিত কৃষিজ, জ্বালানি, ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য আমদানি করত আফগানিস্তান। পাকিস্তানও ফল, শাকসবজি, মসলা, গমসহ বিভিন্ন কৃষিজ ও খাদ্যপণ্য আমদানি করত আফগানিস্তান থেকে। তবে পাকিস্তানের সরকার কর্র্তৃক নিষিদ্ধ রাজনৈতিক গোষ্ঠী তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে ঘিরে সম্প্রতি ব্যাপক তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে ইসলামাবাদ এবং কাবুলের মধ্যে। টিটিপির নেতাকর্মীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়-অর্থ-প্রশিক্ষণ দিচ্ছে আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার এমন অভিযোগ গত প্রায় ৪ বছর ধরে করে আসছে ইসলামাবাদ, তবে কাবুল বরাবরই এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। টিটিপিকে নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে গত ৯ অক্টোবর থেকে ১৫ অক্টোবর সীমান্তে সংঘাতের পর প্রথমে কাতার এবং পরে তুরস্কে শান্তি সংলাপে বসেছিলেন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সরকারি প্রতিনিধিরা। কিন্তু কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াই শেষ হয়েছে সেই সংলাপ।
এদিকে, সীমান্তে সংঘাতের শুরু থেকেই আফগানিস্তানের সঙ্গে যাবতীয় বাণিজ্য বন্ধ রেখেছে পাকিস্তান। স্থলবন্দর ও বাণিজ্য রুটগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছে আফগানিস্তানের রপ্তানি খাত। এই অবস্থায় পাকিস্তানি পণ্য ও বাণিজ্য রুটের ওপর নির্ভরতা কমাতে আফগান ব্যবসায়ীদের ৩ মাস সময় দিয়েছে তালেবান সরকার। আফগানিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী মোল্লা আবদুল গনি বারাদার গত ১২ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন। কাবুলে তার সেই সংবাদ সম্মেলনের ৬ দিনের মাথায় ভারতে আসছেন আফগানিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী। গত মাসে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাক্কির সফরের পর আজিজির এ সফর দুই দেশের মধ্যে ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে অন্যতম উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে আফগানিস্তানে তালেবান নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে কাবুলে ফের দূতাবাস চালুর ঘোষণা দিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লিতে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এ ঘোষণা দেন। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর অন্যান্য অনেক দেশের মতো ভারতও কাবুলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। সেই সঙ্গে নিজেদের দূতাবাস বন্ধ করে দেয় এবং যোগাযোগ সীমিত করে। তবে এখন নয়াদিল্লি সতর্কতার সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মুত্তাকি ও ভারতের শীর্ষ কূটনীতিক বিক্রম মিশ্রি দুবাইয়ে এক বৈঠকে ইরানকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য একমত হন। এরপর মে মাসে জয়শঙ্কর মুত্তাকির সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, ভারত কিন্তু এখনো তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। তালেবানকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে কি না সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। সম্প্রতি রাশিয়ায় আয়োজিত ‘মস্কো ফরম্যাট কনসালটেন্স’-এ আফগানিস্তানের বাগরাম এয়ার বেস যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছিলেন, তার বিরোধিতা জানানো হয়। যেসব দেশ মিলে ওই যৌথ বিবৃতি জারি করেছে, সেই তালিকায় ভারতও রয়েছে, যদিও ওই এয়ার বেসের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। সর্বোপরি দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে আফগানিস্তান ও ভারতের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
