পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে লুকিয়ে আছে এমন কিছু উৎসব, যা আমাদের চিরাচরিত সংস্কৃতি ও ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এই উৎসবগুলোতে মানুষ তার ভেতরের আদিম প্রবৃত্তি, আধ্যাত্মিক একাগ্রতা এবং সামাজিক বন্ধনকে এক নতুন আঙ্গিকে উদযাপন করে। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

শহরের রাস্তায় লাল অগ্ন্যুৎসব

স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশের ছোট্ট শহর বুনোল। প্রতি বছর আগস্ট মাসের শেষ বুধবার এই শান্ত শহরটি পরিণত হয় লাল রণক্ষেত্রে। এটাই বিশ্বের সবচেয়ে বিশৃঙ্খল এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে আনন্দময় উৎসব লা টোমাটিনা বা টমেটো যুদ্ধ। এই এক দিনের জন্য মানুষ তাদের সব মানসম্মান, সামাজিক স্তর এবং শৃঙ্খলার ধারণা ভুলে শুধু লাল, পাকা টমেটোর সমুদ্রে গা ভাসিয়ে দেয়।

উৎসবে অংশগ্রহণকারীরা প্রথমে শহরের মূল চত্বরে জড়ো হয়। উৎসবের শুরুটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক : একটি বিশাল কাঠের খুঁটিতে চর্বি মাখিয়ে রাখা হয় এবং খুঁটির শীর্ষে থাকে একটি হ্যাম (মাংস)। অংশগ্রহণকারীদের লক্ষ্য হলো সেই চর্বিযুক্ত খুঁটি বেয়ে উঠে হ্যামটি নামানো। যদিও এটি আনুষ্ঠানিক সূচনার প্রতীক, বেশিরভাগ সময়ই হ্যাম নামানোর আগেই বেলা ১১টায় জলের তোপ দাগা হয় যা টমেটো যুদ্ধের শুরুর সংকেত।

এর পরেই শুরু হয় উন্মাদনা। ট্রাক ভর্তি হাজার হাজার কেজি পাকা টমেটো শহরের রাস্তায় ঢেলে দেওয়া হয়। চারপাশ থেকে টমেটো ছুড়ে মানুষ একে অপরের ওপর আক্রমণ করে। তবে এখানে একটি অলিখিত নিয়ম রয়েছে : টমেটো ছোড়ার আগে তা অবশ্যই চটকে নিতে হবে, যাতে আঘাত গুরুতর না হয়। ঘণ্টাখানেকের জন্য এই বিশৃঙ্খলায় শহর ডুবে যায়। রাস্তা, দেয়াল, বাড়ি, মানুষ সবকিছুই টমেটোর লাল রসে মাখামাখি হয়ে ওঠে। মনে হয় যেন শহরের বুকে লাল আগুনের বন্যা নেমে এসেছে। ঠিক এক ঘণ্টা পর দ্বিতীয়বার তোপ দাগা হয় এবং যুদ্ধ বন্ধ হয়। এরপর দ্রুত দমকলের পাইপ দিয়ে শহরের রাস্তা পরিষ্কার করা হয়।

লা টোমাটিনার পেছনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আখ্যানটি বেশ গভীর। অনেকে এটিকে নিছক মজা মনে করলেও, মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে দেখেন সামাজিক ক্যাথারসিস হিসেবে। টমেটো যুদ্ধ আসলে মানুষের ভেতরের চাপা পড়া ক্ষোভ, রাগ বা হতাশাকে একটি নিরাপদ ও আনন্দময় উপায়ে প্রকাশের সুযোগ দেয়। ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনের সময়ে এই উৎসব একবার নিষিদ্ধ হয়েছিল, যা প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে এর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। একদিনের এই নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা বাকি ৩৬৪ দিনের জন্য সামাজিক শৃঙ্খলার নিশ্চয়তা দেয়। কারণ, এই উন্মত্ততার পর সবাই মানসিক অবসাদমুক্ত হয়ে দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে পারে।

টোমাটিনা প্রশ্ন তোলে : কেন মানুষ বিশৃঙ্খলা চর্চা করতে চায়? উত্তর সম্ভবত একটাই নিয়মের বেড়াজাল থেকে ক্ষণিকের মুক্তি, যা জীবনকে আরও বেশি সজীব ও অর্থপূর্ণ করে তোলে।

একটি চিজের মূল্য হাত-পা ভাঙা

ইংল্যান্ডের গ্লুসেস্টারশায়ারের ব্রকওর্থ গ্রামের কাছে অবস্থিত কুপারস হিল। এই টিলার ঢালে প্রতি বছর বসন্তের শেষে অনুষ্ঠিত হয় এক মারাত্মক প্রতিযোগিতা যা পরিচিত চিজ রোলিং উৎসব নামে। এই উৎসবটি দেখলে যেকোনো মানুষের মনে হতে পারে : একটি গোল চিজ ধরার জন্য মানুষ কতটা ঝুঁকি নিতে পারে?

উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো ডাবল গ্লুসেস্টার নামক গোলাকার এক চিজ। এই চিজটিকে প্রথমে একটি কাঠের ফ্রেমে আটকানো হয়, যাতে এটি দ্রুত গড়িয়ে না যায়। তারপর পাহাড়ের প্রায় এক-দুই গ্রেডিয়েন্টের খাড়া ঢাল থেকে চিজটিকে গড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপরই শুরু হয় উন্মাদনা : শত শত অংশগ্রহণকারী চিজটিকে ধরার জন্য পাগলের মতো দৌড়াতে শুরু করে। কিন্তু চিজের গতিবেগ প্রায় ১১০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে, যা ধরা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। ফলস্বরূপ বেশিরভাগ মানুষই দৌড়ানোর বদলে গড়িয়ে নিচে নামতে থাকে।

এই প্রতিযোগিতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রতি বছরই অসংখ্য মানুষ হাত-পা ভাঙে, মচকে যায় বা গুরুতর আঘাত পায়। চোট-আঘাত এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও, স্থানীয় এবং বহিরাগত প্রতিযোগীদের ভিড় কমে না।

এই চিজ রোলিং লোক-সংস্কৃতি এবং আদিম অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি মানুষের আসক্তির একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। এর উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন লোককথা থাকলেও, এটি প্রায় ২০০ বছর ধরে চলে আসছে এবং স্থানীয় ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক প্রয়াস। প্রতিযোগীরা এই ইভেন্টটিকে তাদের ব্যক্তিগত সাহসিকতা ও বীরত্বের প্রতীক হিসেবে দেখে। এর পেছনের মনস্তত্ত্বটি হলো : দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে এসে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে আনন্দ খোঁজা। মানুষ কেন এমন ঝুঁকির প্রতি আসক্ত? সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এ ধরনের আদিম শারীরিক প্রতিযোগিতা সমাজে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার একটি মাধ্যম। এখানে জয়ী হওয়াটা মুখ্য নয়, মুখ্য হলো সাহস করে খাড়া পাহাড় বেয়ে নেমে আসার অভিজ্ঞতা।

বিপদের মধ্যেও আনন্দ খুঁজতে এবং চরম শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বকে উদযাপন করতে শেখায় কুপারস হিল চিজ রোলিং।

বোরিয়ং মাড ফেস্টিভাল

দক্ষিণ কোরিয়ার বোরিয়ং মাড ফেস্টিভাল (যা অনেকে ‘গোপর্ণক’ বা ‘কাদার প্লাবন’ নামেও জানেন) গ্রীষ্মকালে বোরিয়ং শহরকে এক ভিন্ন রূপ দেয়। মূলত স্থানীয় কাদার গুণাগুণ প্রচারের বাণিজ্যিক কৌশল হিসেবে শুরু হলেও, এটি এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় শারীরিক মুক্তির উৎসবে পরিণত হয়েছে।

উৎসবের মূল উপাদান হলো বোরিয়ং উপকূলের মিনারেল সমৃদ্ধ কাদা, যা ত্বকের জন্য উপকারী। গ্রীষ্মের গরমে শহরের কেন্দ্রে ট্রাক ভরে কাদা এনে তৈরি করা হয় বিশাল খেলার মাঠ। এখানে চলে কাদামাটির কুস্তি, স্লাইড, দৌড় এবং কাদা স্পা-এর মতো নানা ধরনের খেলা। অংশগ্রহণকারীরা হাসিমুখে একে অপরের ওপর কাদা মাখায় এবং নোংরা হওয়ার সম্পূর্ণ আনন্দ উপভোগ করে।

এটি আধুনিক সমাজের এক অ-আধ্যাত্মিক মাধ্যম, যা শারীরিক ও মানসিক অবসাদ মুক্তির সুযোগ দেয়। বোরিয়ং মাড ফেস্টিভালে সামাজিক সীমানা ভেঙে যায়; ধনী-দরিদ্র, স্থানীয়-বিদেশি নির্বিশেষে সবাই একই কাদায় গড়াগড়ি খেয়ে নিজেদের সামাজিক পরিচয় ভুলে যায়। কাদা এখানে শুধু ময়লা নয়, বরং আরোগ্য, বন্ধন এবং একাত্মতার প্রতীক। এই উৎসব প্রমাণ করে যে, মানব-আচারে প্রাকৃতিক উপাদানের গুরুত্ব কতটা গভীর। মানুষ মাটির সঙ্গে একাত্ম হয়ে মানসিক ও শারীরিক সতেজতা লাভ করে। একই সঙ্গে, এটি একটি সফল পর্যটন কৌশল, যা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক স্তরের জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

আধ্যাত্মিক সহনশীলতা

তামিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে থাইপুসাম এক পবিত্র উৎসব, যা আধ্যাত্মিকতা এবং চরম শারীরিক কষ্টের মাধ্যমে প্রতিজ্ঞা পূরণের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এটি সাধারণত তামিল  ‘থাই’ মাসে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয়। এই উৎসবের প্রধান আরাধ্য দেবতা হলেন মুরুগান (কার্তিকেয়)।

থাইপুসাম শুধু উপবাস ও প্রার্থনার মাধ্যমে পালিত হয় না; বরং এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ভক্তদের দ্বারা শারীরিক উৎসর্গ। ভক্তরা দীর্ঘদিন ধরে কঠোর উপবাস, যৌন ব্রহ্মচর্য এবং মানসিক শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া পালন করেন। উৎসবের দিনে তারা নিজেদের শরীরে ধারালো ধাতব বস্তু বা হুক বিঁধিয়ে ‘কাভাদি’ নামক বিশাল ও ভারী কাঠামো বহন করে মন্দিরে হেঁটে যান। এই কাভাদিগুলো ফল, ফুল ও ময়ূরের পালক দিয়ে সাজানো থাকে।

শরীরে হুক বিঁধিয়ে ভার বহন করা ছাড়াও, অনেক ভক্ত তাদের মুখের গাল বা জিহ্বা ভেদ করে ছোট বর্শা বা ‘ভেল’ প্রবেশ করান। এই ভেল প্রতীকীভাবে ভক্তকে কথা বলা বা বস্তুগত বিষয়ে মনোনিবেশ করা থেকে বিরত রাখে, যা আধ্যাত্মিক একাগ্রতা ও নীরবতার প্রতীক। বিস্ময়করভাবে, এই প্রক্রিয়ার সময় ভক্তদের মুখে তীব্র ব্যথা বা রক্তপাতের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তারা এক ধরনের আবেশ বা ট্রান্স অবস্থায় থাকে বলে মনে করা হয়।

এই উৎসবের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আখ্যানটি অত্যন্ত শক্তিশালী। থাইপুসামকে শরীর ও আত্মার সংযোগের চরম উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে, এই তীব্র শারীরিক কষ্টের বিনিময়ে তারা দেবতা মুরুগানের কাছ থেকে আশীর্বাদ লাভ করেন এবং তাদের কৃতকর্ম বা ঋণ শোধ করেন। অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে, এ ধরনের দৈহিক কষ্ট ভোগ হলো আধ্যাত্মিক সহনশীলতার প্রমাণ, যেখানে ব্যথাকে শুদ্ধিকরণ এবং উচ্চতর শক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি মানব মন ও শরীরের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলে : মানুষের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস কতদূর পর্যন্ত দৈহিক সীমানাকে অতিক্রম করতে পারে?

মাঙ্কি বুফে

থাইল্যান্ডের লোপবুরি প্রদেশ এক অদ্ভুত ও মনোহর উৎসবের জন্য বিশ্ব জুড়ে পরিচিত। এই উৎসবটি হলো মাঙ্কি বুফে বা বানরের জন্য বিশাল ভোজের আয়োজন, যা প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবটি শুধু পর্যটকদের আনন্দ দেওয়ার জন্য নয়, বরং এটি মানব এবং বন্যপ্রাণীর মধ্যে দীর্ঘদিনের সহাবস্থান ও শ্রদ্ধার এক চমৎকার উদাহরণ।

উৎসবের দিনে, লোপবুরি শহরের প্রাচীন মন্দির এবং ধ্বংসাবশেষের আশপাশে বিশাল টেবিল সাজানো হয়। এই টেবিলগুলো সম্পূর্ণরূপে ফল, সবজি, মিষ্টি, পানীয় এবং নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার দিয়ে বোঝাই থাকে। এই রাজকীয় ভোজের আমন্ত্রিত অতিথি হলো শহরের ম্যাকাক বানরের দল। উৎসব শুরু হলে, শত শত বানর নেমে আসে এবং নির্বিঘ্নে সেই খাবার উপভোগ করতে শুরু করে। স্থানীয়রা আনন্দ করে তাদের বানর প্রতিবেশীদের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং তাদের জন্য গান গায়।

এই উৎসবের পেছনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আখ্যানটি স্থানীয় লোককথা এবং পুরাণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। থাই সংস্কৃতিতে বানরকে হিন্দু দেবতা হনুমানের বংশধর হিসেবে দেখা হয় (রামায়ণের স্থানীয় সংস্করণের প্রভাব)। স্থানীয়রা বিশ্বাস করে যে, বানরদের যত্ন নিলে এবং তাদের ভোজন করালে তা তাদের জন্য সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি এবং ভালো ফসল নিয়ে আসে। এই ভোজের মাধ্যমে তারা মূলত ভাগ্য ও প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

মাঙ্কি বুফে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে : মানব সমাজে প্রাণিজগৎকে কতটা সম্মান দেওয়া হয়? এই উৎসব দেখায় যে, মানুষ এবং বন্যপ্রাণী একে অপরের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে এবং বন্যপ্রাণীকে কোনো ধরনের ক্ষতি না করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারে।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *