দক্ষিণবঙ্গের প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম স্তম্ভ পুরুলিয়ার পাহাড় ও জঙ্গল আজ অস্তিত্বের সঙ্কটে। হুড়া ব্লকের ৩৬০ মিটার উঁচু প্রাচীন পাঞ্জানিয়া পাহাড় সরকারি নির্দেশে কেটে গ্রানাইট তোলার কাজ চলছে। রবিবার এই প্রকৃতি ধ্বংসের প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক, গবেষক, পড়ুয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। প্ল্যাকার্ড হাতে তাঁদের দাবি, শুধু পাঞ্জানিয়া নয়—তিলাবনী, বেড়ো সহ জেলার আরও কয়েকটি পাহাড় কেটে পাথর উত্তোলনের চক্রান্ত চলছে। এতে পুরো অঞ্চলের পরিবেশ, জলসম্পদ এবং গ্রামীণ জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়বে।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, পাহাড় শুধু পাথরের স্তূপ নয়; তাদের জীবনের অবলম্বন। পাহাড়ের মাথায় গ্রামদেবতার স্থান, পাহাড় বেয়ে নেমে আসা বৃষ্টির জলেই এলাকা সজীব থাকে, পুকুর-কুয়ো জল পায়, চাষের জমি বাঁচে। পাহাড় কেটে দিলে এলাকা জলবিহীন হয়ে পড়তে পারে এবং মরুভূমির মতো অবস্থা তৈরি হবে। জ্বালানি ও ঔষধি গাছ সংগ্রহের জন্য স্থানীয়রা পুরোটাই পাহাড়ের উপর নির্ভরশীল বলেও দাবি করেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ বেরা বলেন, পাঞ্জানিয়া ও আশপাশের পাহাড় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি বছরের প্রাচীন প্রিক্যামব্রিয়ান যুগের শিলা—যে যুগ পৃথিবীর সৃষ্টির আদিপর্বের দলিল। সামান্য আর্থিক লাভের আশায় এই অমূল্য জিও-হেরিটেজ ধ্বংস করা অপরাধ। পাহাড় কাটলে বাতাসে ধূলিকণা ছড়িয়ে এলাকায় ফুসফুসের রোগ বাড়বে, পরিবেশের ভারসাম্য ভেঙে পড়বে। তাঁর মতে, পাথর বিক্রির চেয়ে এই অঞ্চলকে ‘জিও-ট্যুরিজম’ এলাকায় পরিণত করলে সরকার বহু গুণ বেশি রাজস্ব পেতে পারে, সঙ্গে প্রকৃতিও রক্ষা পাবে।

অন্যদিকে প্রশাসন জানিয়েছে, সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা চলছে। হুড়ার বিডিও আরিকুল ইসলাম বলেন, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, ভূমি দফতরের আধিকারিক এবং গ্রামবাসীদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে একটি বিস্তৃত বৈঠক ডাকা হবে। সব পক্ষের মতামত শুনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

খননকারী সংস্থার পক্ষে ম্যানেজার সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, সরকারি অনুমতি নিয়েই পাথর তোলা হচ্ছে এবং কোনও অনিয়ম হয়নি। গ্রামবাসীদের আপত্তির কারণে কাজ ধীরগতিতে চলছে। মেন্টেন্যান্সের কারণে প্রতিদিন খুব কম সময় কাজ হয় এবং পাহাড়ের নিচের অংশ থেকেই নির্দিষ্ট মাপে পাথর তোলা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে প্রকৃতি সুরক্ষা বনাম খননকার্যের স্বার্থ—দুইয়ের টানাপোড়েনে প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে পুরুলিয়ার পাহাড়। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের সিদ্ধান্তই ঠিক করবে প্রাচীন জিও-সম্পদ টিকে থাকবে, নাকি গ্রানাইট বেচে হারিয়ে যাবে পাহাড়ের অস্তিত্ব।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *