ছবির উৎস, Humayun Kabir/Facebook
“মুসলমানরা বোকা, ওদের ভোট ভাগ করে বিজেপিকে সাহায্য করব”- পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের নিয়ে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী হুমায়ুন কবীরের এরকম বক্তব্যসহ একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি বিবিসি।
মি. কবীর মুর্শিদাবাদ জেলার একজন রাজনীতিবিদ। তিনি বিদায়ী বিধানসভার সদস্য ছিলেন, আসন্ন ভোটেও দুটি আসন থেকে লড়ছেন। কিছুদিন আগে তাকে নানা বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে তৃণমূল কংগ্রেস দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে। বাবরি মসজিদের আদলে মুর্শিদাবাদে একটি মসজিদ গড়ছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার তৃণমূলপন্থি একাধিক ফেসবুক পেজ থেকে এই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভেঙে যায় মি. কবীরের ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’র সাথে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (মিম)-এর জোট।
হুমায়ুন কবীরের মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে মি. ওয়েইসির দল।
পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে দুই ‘সংখ্যালঘু দলের’ জোট ভাঙন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
এক সময় কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত হুমায়ুন কবীর সেই দল ছেড়ে বিজেপি এবং তারপরে তৃণমূল কংগ্রেসে যান, অর্থাৎ তিনটি তিনটি দলেই কোনো না কোনো সময় ছিলেন।
সম্প্রতি তিনি ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ নামে নিজের দল গড়েছেন।
ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images
জোট ভাঙলেন আসাদউদ্দিন ওয়েইসি
হুমায়ুন কবীরের ভাইরাল ভিডিও বিষয়ে শুক্রবার ভোরবেলা সমাজমাধ্যমে বিবৃতি দেয় মিম। তাতে লেখা হয়েছে, “মিম এমন কোনো বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না যেটা মুসলিমদের মর্যাদাকে আঘাত করে।”
“কবীরের দলের সঙ্গে তাদের জোট প্রত্যাহার করে নিয়েছে মিম। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা অন্যতম দরিদ্র, অবহেলিত এবং নিপীড়িত একটি জনগোষ্ঠী। কয়েক দশক ধরে ধর্মনিরপেক্ষ শাসন থাকা স্বত্বেও তাদের জন্য কিছুই করা হয়নি,” লেখা হয়েছে ওই বিবৃতিতে।
মিমের এক্স হ্যান্ডলে আরো লেখা হয়, “যে কোনো রাজ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে মিমের নীতি হল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেন একটি স্বাধীন রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর পায়। আমরা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব এবং ভবিষ্যতে কোনো দলের সঙ্গে আমাদের কোনো জোট থাকবে না।”
এই ভিডিওটি সত্যি কি না তা এখনো কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি। অবশ্য হুমায়ুন কবীর এই ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে নির্মিত বলে অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগ স্বত্বেও ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক হারে শেয়ার হচ্ছে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, হুমায়ুন কবীর দাবি করেছেন, তাকে এক হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে ও ইতোমধ্যেই দুশো কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দফতর এবং আরও কিছু নেতার নামও উল্লেখ করেছেন।
তবে এই ভিডিও নিয়ে বিজেপি এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
ছবির উৎস, @aimim_national/x
কী বলছে তৃণমূল কংগ্রেস?
তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী কুণাল ঘোষ নয়ই এপ্রিল, বৃহস্পতিবার কলকাতায় অনুষ্ঠিত একটি সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। ভিডিওটি দেখিয়ে মি. কবীরকে কটাক্ষ করে বলেন, ভারতীয় জনতা পার্টির কিছু “বি টিম এবং সি টিম” তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ভাগ করার কাজে সাহায্য করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, “মুসলিম ভোট ভাগ করার জন্য হুমায়ুন কবীর এবং আরও কিছু মানুষকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা একটা ভিডিও পেয়েছি যা স্পষ্টভাবে এটাই প্রমাণ করে।”
তিনি এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-র তদন্তের দাবিও জানান।
কলকাতার বর্তমান মেয়র ও কলকাতা বন্দর বিধানসভা আসনের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী ফিরহাদ হাকিমের দাবি, “ভোট কেনা-বেচার জন্য ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজ্যের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) করেও বিজেপি বাংলাকে থামাতে পারেনি।”
“সুবিধাবাদী নেতা, যিনি বারবার বিজেপি থেকে কংগ্রেস এবং কংগ্রেস থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে দলবদল করেন,” মন্তব্য ফিরহাদ হাকিমের।
তিনি আরো বলেন, “আমার ধর্মকে এই হুমায়ুন কবীর বিক্রি করছেন। তাকে শুধু বিশ্বাসঘাতক বলা যথেষ্ট নয়। আমি তাকে চিনি, সেই কারণেই আমি এখানে বসে ওকে সাসপেন্ড করে দল থেকে বের করে দিয়েছিলাম।”
মুসলমান সমাজকে আবেদন করে মি. হাকিম বলেন, “যারা ওকে সমর্থন করছিলেন, তাদের এবার বোঝার সময় এসেছে যে হুমায়ুন কবীর কেমন ধরনের মানুষ। উনি মুসলিমদের আত্মসম্মান বিজেপির কাছে বিক্রি করার ষড়যন্ত্র করেছেন।”
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অভিযোগ
গত বছর চৌঠা ডিসেম্বর মি. কবীরকে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে সাসপেন্ড করা হয়। তার সাস্পেনশনের কারণ হিসেবে তখন বলা হয়- ‘সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি’।
তিনি সেই সময়ে মুসলিম সমাজের কাছে মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙ্গায় একটি নতুন ‘বাবরি মসজিদ’ নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
দল থেকে সাসপেন্ড করার সময়ে, মি. হাকিম অভিযোগ করেছিলেন, মি. কবীরের পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করার প্রস্তাবের পেছনে ‘ধর্মীয় উসকানি’ আছে।
“বাবরি মসজিদ তো উত্তর প্রদেশে, এখানে তার তাৎপর্য্য কী? এগুলো শুরু হয়েছে এখানে আমাদের শান্ত পরিবেশ কে নষ্ট করার জন্য।
“এটা বিজেপির টাকা। এখানেও বিজেপির ষড়যন্ত্র, ওখানেও বিজেপির ষড়যন্ত্র,” মন্তব্য করেছিলেন মি. হাকিম।
ছবির উৎস, AITC/Facebook
কী বলছেন বিশ্লেষকরা?
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ বিবিসিকে বলেছেন, “ভোটারদের একটা ভোট ব্লক হিসেবে দেখার প্রবণতা সবসময়েই ছিল। এটা আমরা বিজেপির ক্ষেত্রেও দেখি, যারা হিন্দুদের এক হতে বলে, আর দাবি করে যে তাদের এই দলই নিরাপদ রাখবে।”
“সংখ্যালঘুদের একটা ভোটব্লক হিসেবে দেখা আরো সহজ, কারণ তারা অনেকটা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন,” মন্তব্য তার।
মি. মাহমুদের মতে, “হুমায়ুন কবীরের মতো রাজনীতিবিদরা এটা খুব স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তারা কেবল নিজের স্বার্থ পূরণ করেন। তার ঘন ঘন দল বদল থেকে সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়। এই ভিডিওটার সত্যতা জানা না থাকলেও এটা মানুষ অবিশ্বাস করবে বলে আমার মনে হয় না, কারণ মি. কবীরের মতন মানুষের ক্রেডিবিলিটি খুব কম।”
বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতার মতো ইস্যু উঠে এলেও মুসলমান সমাজের সার্বিক উন্নয়ন ও শিক্ষা খুব একটা মূল নির্বাচনী ন্যারেটিভের অংশ হয়নি।
এর ফলে মুসলমানরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করেন অধ্যাপক জাদ মাহমুদ, “এই কারণেই মুসলমান সমাজের সিংহভাগ মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংক হয়ে পড়ে।”
পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা এখনো পর্যন্ত জাতি ধর্ম দেখে ভোট দেন না বলে মত মি. মাহমুদের।
তার মতে, “বেশিরভাগই দেখে, এই রাজনৈতিক দলটি আমার জন্য কী করবে? এরা ক্ষমতায় এলে আমি কী লাভ করব? মি. কবীর যা করছেন, সেটার প্রভাব খুবই লোকাল হবে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের কাছে প্রধান প্রশ্ন, বিজেপিকে কীভাবে আটকানো যায়।”
“এখানে যদি আজ বিরোধী শুধু কংগ্রেস বা সিপিআইএম হতো, তাহলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। বিজেপি ২০২১ সালেও চেয়েছিলো মুসলিম ভোট ভাঙতে, কিন্তু পারেনি। এইবারও তারা যে সেটাই চাইছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।”
