রাৃঙ্গামাটি শহরে যেখানে ছিলাম, জায়গাটা অতি মনোরম। ছয়তলায় ক্যাফেটেরিয়াতে সকালে নাস্তার টেবিলে বসে চোখ জুড়িয়ে গেল। পূর্ব দিকের কাচের চওড়া দেয়াল ভেদ করে ঝলমলে রোদ আসছে। ওপাশে পাহাড়ের পায়ের কাছে নীল পানির হ্রদ। ঢেউ তিরতির করছে। সকালের রোদের আলো, হ্রদের পানিতে প্রতিফলিত হয়ে ঝিলিক দিয়ে উঠছে। নাস্তার টেবিলে সঙ্গে ছিলেন উচিমং মারমা। স্থানীয় তুখোড় তরুণ। বললেন, কিছু শুনতে পাচ্ছেন? বললাম কী শুনব, কোন ধরনের? উচিমং দা বললেন, কাপ্তাই হ্রদের আর্তনাদ! কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। উচিমং দার কাছ থেকে যা শুনলাম, তা শুধু রাঙ্গামাটির নয় পুরো বাংলাদেশের করুণ কাহিনি। কাপ্তাই হ্রদের নিচে ঘুমিয়ে আছে এক রাজ্যের স্মৃতি : রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসকের বাংলোর পাশে, কাপ্তাই হ্রদের নীল জলের পাড়ে, হ্রদের স্বচ্ছ নীল জলের বুকে অনেক সময় দেখা যায় মানুষের ভিড়। কেউ হ্রদের পাড়ে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে চেয়ে আছে নীল জলের দিকে গভীরে, আরও গভীরে, যেন জল সরিয়ে সে মাটির সন্ধান করছে খোলা দৃষ্টি দিয়ে। কেউবা ছোট নৌকা নিয়ে চলে গেছে হ্রদের মাঝখানে। যেন অনেকে প্রতীক্ষা করছে, ইতিহাসের কোনো অলৌকিক দৃশ্য দেখবে বলে। নতুন কেউ এমন দৃশ্য দেখলে অবাক হবে, কিন্তু রাঙ্গামাটির মানুষ জানে ওই জলের নিচে আছে এক রাজকীয় অতীত, এক হারানো সৌন্দর্য। ওখানেই আছে চাকমা রাজার ডুবে যাওয়া রাজপ্রাসাদ যে প্রাসাদ ৬৫ বছর ধরে কাপ্তাই হ্রদের জলের নিচে ঘুমিয়ে আছে, পাহাড়ের ইতিহাস আর কষ্টের নীরব সাক্ষী হয়ে।
হারানো ইতিহাস : ১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর যখন বাঁধ নির্মাণ করা হয়, তখন সৃষ্টি হয়েছিল বিশাল কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম হ্রদ। উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে এই বাঁধ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় নতুন অধ্যায় যোগ করেছিল। কিন্তু এ উন্নয়নের প্রবল জোয়ারে হারিয়ে গেছে অসংখ্য পাহাড়ি গ্রাম, ডুবে গেছে হাজারো ঘরবাড়ি, আর তার সঙ্গে তলিয়ে গেছে চাকমা রাজার রাজকীয় রাজবাড়ি। বিশাল জনপদ মুহূর্তে হয়ে গেছে জলবন্দি, সেখান থেকে উচ্ছেদ হয়েছে প্রায় এক লাখ মানুষ। তাদের অনেকেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে, কেউ চলে গেছে অন্য জেলায়, আবার কেউ বা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেছে। চাকমা রাজবাড়ির সেই নিমজ্জন যেন কেবল এক রাজপ্রাসাদের ডুবে যাওয়া নয় পুরো একটি জাতির মানসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার প্রতীক।
রাজকীয় শেকড়ের গল্প : চাকমা রাজাদের ইতিহাস বহু পুরনো। তাদের আদি রাজপ্রাসাদ ছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। সেখানে রাজত্ব করতেন খ্যাতনামা চাকমা রানী কালিন্দী রায় দূরদর্শী, সাহসী ও প্রজাপ্রেমী এক নারীশাসক। ১৮৭৪ সালে তার মৃত্যুর পর রাজপুত্র হরিশ্চন্দ্র রায় রাজা হন। তিনি রাঙ্গুনিয়া ছেড়ে রাঙ্গামাটিতে নতুন রাজপ্রাসাদ তৈরি করেন। পাহাড়ের কোলে, নদীর ধারে বানানো সেই প্রাসাদ শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রই ছিল না ছিল শিল্প, সংস্কৃতি আর ধর্মীয় ঐতিহ্যের মিলনস্থল। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর উপহাসে ১৯৬০ সালে কর্ণফুলী বাঁধের জলে ডুবে গেল সেই রাজপ্রাসাদ। রাজকক্ষ, সভাঘর, বাগান, মন্দির সব হারিয়ে গেল নীলজলের গহিন অতলে।
জলের নিচের শহর : ইতিহাস পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। মাঝে মাঝে, যখন হ্রদের জল অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, তখন জলের নিচ থেকে দেখা মেলে সেই রাজপ্রাসাদের অবয়ব ভাঙাচোরা দেয়াল, শ্যাওলায় ঢাকা স্তম্ভ, রাজপ্রাসাদের ইট-পাথরের টুকরো। তখন মানুষের ভিড় জমে যায় জেলা প্রশাসকের বাংলোর পাশে হ্রদের তীরে। অসংখ্য মানুষ দেখতে আসেন সেই হারানো রাজপ্রাসাদ যে প্রাসাদ একদিন ছিল পাহাড়ি গৌরবের প্রতীক, আজ তা পরিণত হয়েছে দুঃখ আর স্মৃতির প্রতীকে। স্থানীয়রা বলেন, কখনো কখনো পরিষ্কার আবহাওয়ায় জলের তলায় দেখা যায় প্রাসাদের পুরনো সিঁড়ি, পাথরের স্তম্ভ, এমনকি রাজদরবারের খানিকটা অংশও।
ইতিহাসের নিচে ঘুম : আজ যখন কাপ্তাই হ্রদের জল কমে, তখন অতীতের মতো মানুষ ভিড় করে হ্রদের তীরে। তারা দেখতে চায়, ইতিহাসের সেই হারানো সৌন্দর্য চাকমা রাজার রাজবাড়ি, যা আজও নীরবে পাহারা দিচ্ছে এক জাতির গৌরব আর এক বেদনার কাহিনি। কাপ্তাই হ্রদের তিরতিরে ঢেউয়ের নিচে যেন ঘুমিয়ে আছে, রাঙ্গামাটির প্রাণ তার ইতিহাস, মানুষ, আর হারিয়ে যাওয়া রাজপ্রাসাদ। প্রতিবার হ্রদের জল কমলে, রাঙ্গামাটির বুক থেকে যেন ধীরে ধীরে জেগে ওঠে সেই নীরব অতীত যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসকে কখনো পুরোপুরি ডুবিয়ে রাখা যায় না।
মুছে না যাওয়া স্মৃতি : চাকমা সার্কেল কার্যালয়ের কর্মকর্তা জানালেন, ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ তৈরির পর রাজবাড়ি গভীর জলের নিচে ডুবে গেছে। ডুবে যাওয়ার পর নতুন রাজবাড়ি তৈরি করা হয়েছে, শহরের এখনকার রাজবাড়ি এলাকায়। তবে পুরাতন রাজবাড়ির পাশের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধবিহারটি রক্ষা করা যায়নি। বিশাল এক বুদ্ধমূর্তি এখনো থেকে গেছে, কিন্তু মন্দিরটি হারিয়ে গেছে জলের নিচে। শিক্ষাবিদ ও সাবেক মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নিরূপা দেওয়ান আজও ভুলতে পারেননি, সেই রাজপ্রাসাদের দিনগুলোর কথা।
উন্নয়ন ও বেদনার মুখ : কাপ্তাই বাঁধের প্রকল্প নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে একইসঙ্গে একটি মানবিক বিপর্যয়েরও নাম। উন্নয়নের নামে পাহাড়ি জনপদের সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং সামাজিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। পুনর্বাসন হয়নি অধিকাংশ মানুষের। হারিয়ে গেছে জমি, পেশা, ভাষা ও উত্তরাধিকার। আজও রাঙ্গামাটির মানুষ কাপ্তাই হ্রদের জলে তাকিয়ে দেখে কীভাবে উন্নয়ন কখনো কারও জন্য স্বপ্ন, আবার কারও জন্য নিঃশব্দে কেঁদে ওঠা ইতিহাস।
করুণাময়ের স্মৃতিচারণ : রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির করুণাময় চাকমা শুনিয়েছেন, নীল জলের হ্রদের নিচে হারিয়ে যাওয়া তার গ্রামের কথা। বললেন রাঙ্গামাটির নীল জলের গা ঘেঁষে, পাহাড়ের কোলে আজ যে কাপ্তাই হ্রদ জেগে আছে, তার নিচে চুপচাপ হয়ে আছে এক হারানো গ্রামের গল্প। যে গ্রামটি ছিল করুণাময় চাকমার শৈশবের স্বপ্নের ঠিকানা ঝগড়াবিল। মাঠের সবুজ, বিলের জলে সাঁতার কাটার আনন্দ, পদ্মফুলে ভরা দিঘি সবই ছিল তার জীবনে। ঝগড়াবিল নাম শুনলেই, মনে পড়ে মানুষের মধ্যে হাসিমুখর ঝগড়া। গ্রামের মানুষদের জীবন ছিল সরল, এবং বড় হৃদয়। বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম সবাই মিলেমিশে থাকত। উৎসব মানে ছিল গান, নাচ, খেলা আর মেলার হাসিতে মুখরিত হওয়া। তার বাবা শুম্ভমুনি চাকমা তখন গ্রামের পুলিশ। মানুষের সঙ্গে মেশা, তাদের দুঃখ-কষ্ট ভাগ করা এই শিক্ষা করুণাময় পেয়েছেন ছোটবেলায় বাবার কাছে। কিন্তু সব শান্তি স্থায়ী হয় না। ১৯৫০-এর দশকে করুণাময় শোনেন, অদ্ভুত এক খবর কর্ণফুলী নদীতে বৃহৎ বাঁধ তৈরি হবে। সেই বাঁধের জল এত বিশাল হবে যে ঝগড়াবিল, পদ্মবিল আর হাজার হাজার মানুষের জন্মভূমি চিরতরে ডুবে যাবে। খবর শুনে গ্রামজীবনের মাটি কেঁপে ওঠে। শৈশবের বন্ধু সকল, খেলার মাঠ, নদীর ধারে পদ্মফুল সবই যেন খালি চোখের সামনে বিলীন হয়ে যাবে। কিছুই থাকবে না। করুণাময় তখন ছোট, কিন্তু বুঝতে পারেন তার স্বপ্ন, স্মৃতি, শৈশব সব বদলে যাবে। পরিবার নিয়ে করুণাময় চলে যান কাজলং রিজার্ভ ফরেস্টে। নতুন জায়গা, নতুন জীবন। জঙ্গল, অজানা প্রাণী, অচেনা রোগ, অভাব সব কিছু প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ হয়ে আসে। তারা দিনরাত পরিশ্রম করে নতুন বাড়ি বানান, ফসল চাষ করেন। কিন্তু হারানো গ্রামের প্রত্যেকটি স্মৃতি করুণাময়ের মনে আজও এক অমোচনীয় দাগ হয়ে আছে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে বিলের পানি, পদ্মফুল, বন্ধুদের হাসিঠাট্টা, গাছের ছায়া সবকিছু যেন একেবারে জীবন্ত। এরপর বাঁধ তৈরি হয়, জল বাড়তে থাকে। গ্রামের মানুষ নৌকায় কিছু সামান্য জিনিস নিয়ে রওনা হয়ে যায় অজানার পথে। অনেক কিছু হারিয়ে যায় ঘর, মাঠ, প্রিয়স্থান। করুণাময় মনে করে বলেন আখের গুড়, মরিচের ফসল, গ্রামের উৎসব সবই এখন কেবল স্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে। অনেক রাতে তিনি নদীর ধারে বসে ভাবতেন, আমাদের গ্রাম এখন কোথায়? পানির নিচে হারিয়ে গেছে কি শুধু ঘর, নাকি সমস্ত জীবন কাহিনি! করুণাময়ের সেই ভাবনার প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।
করুণাময় বড় হয়ে শহরে আসেন। কাপ্তাই হ্রদের নীল জলে এখনো তার শৈশবের ছায়া ভেসে ওঠে। পর্যটকরা এখানে ঘুরে আনন্দ নিয়ে ছবি তোলে, নৌকায় চড়ে হ্রদের নীল জলে ভেসে যায়। কেউ হয়তো ভাবে না, এই নীল জলের নিচে পুরো এক প্রজন্মের শৈশব, হাজারো মানুষের স্মৃতি, আর হারানো হাসি লুকিয়ে আছে। করুণাময়ের মনে হয়, ঝগড়াবিল শুধু একটি জায়গা নয়, এটা মানুষের ইতিহাস, সংগ্রাম, ভালোবাসা এবং আশা। যখন তিনি পাহাড়ের ঢালে চোখ রাখেন, মনে পড়ে গ্রামের মানুষের হাসি, শৈশবের খেলা, মা-বাবার আদর, বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ সব যেন হ্রদের নীল জলে ভাসছে। কাপ্তাই হ্রদের এই নীল জলে ভাসতে থাকে হারানো এক গ্রামের কান্না, হাহাকার, আশা এবং মানুষের লড়াই করে টিকে থাকা। করুণাময় জানেন, হারিয়ে যাওয়া গ্রামের স্মৃতি আর কখনো ফিরবে না। তবু তিনি বলেন মাটি হারানো যায়, জলের প্লাবন সব তলিয়ে দিতে পারে, মানুষের মনে থাকা স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। সেই স্মৃতি বাঁচিয়ে রেখেছেন করুণাময়, আর তার চোখে ভেসে ওঠে ঝগড়াবিলের হাসি, কান্না-ভালোবাসা। এই কাহিনি শুধু করুণাময়ের একার নয়। এই কাহিনি হারিয়ে যাওয়া এক গ্রামের মানুষের, তাদের সংগ্রামের, আশা এবং জীবনের। কাপ্তাই হ্রদ, তার নীল জল, আমাদের বলে দেয় একটা গ্রাম হারিয়ে গেলেও, তার কথা, তার মানুষ, চিরকাল বেঁচে থাকে হৃদয়ে, গহিন অতল ভালোবাসায়।
লেখক: চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট ইউনিসেফ
