খবর অনলাইন ডেস্ক: ২০২৫ সাল ভারতীয় বিনোদনজগতের জন্য এক গভীর শোকের বছর হয়ে রইল। বলিউড, টেলিভিশন ও সংগীতদুনিয়ার একের পর এক জনপ্রিয় তারকার প্রয়াণে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। ধর্মেন্দ্র থেকে শুরু করে জুবিন গার্গ, মনোজ কুমার, সুলক্ষণা পণ্ডিত — এঁদের অবদান চিরকাল দর্শক ও অনুরাগীদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে। চলতি বছরে আমরা যাঁদের হারিয়েছি, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১০ জন তারকার কথা তুলে ধরা হল।
ধর্মেন্দ্র
প্রবীণ বলিউড অভিনেতা ধর্মেন্দ্র প্রয়াত হন ২৪ নভেম্বর, মুম্বইয়ে। বয়স হয়েছিল প্রায় ৯০ বছর। ছয় দশকেরও বেশি দীর্ঘ কেরিয়ারে তিনি ৩০০-রও বেশি ছবিতে অভিনয় করেন। ‘শোলে’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘সত্যকাম’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও স্মরণীয়। শ্রীরাম রাঘবনের যুদ্ধভিত্তিক ছবি ‘ইক্কিস’ তাঁর শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি। আগামী ১ জানুয়ারি এই ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা।
জুবিন গার্গ
বলিউড, অসম ও বাংলার সংগীতজগতের এক স্মরণীয় নাম জুবিন গার্গ। গায়ক ও সুরকার জুবিন মারা যান ১৯ সেপ্টেম্বর, সিঙ্গাপুরে। সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানানো হয়। পরে অসম পুলিশের এসআইটি চার জনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগে চার্জশিট দেয়। তাঁর মৃত্যুতে অসম জুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয় এবং তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়।

(বাঁ দিক থেকে) সতীশ শাহ, শেফালি জরিওয়ালা এবং আসরানি।
মনোজ কুমার
দেশাত্মবোধক ছবির জন্য পরিচিত অভিনেতা মনোজ কুমার প্রয়াত হন ৪ এপ্রিল, মুম্বইয়ে। ৮৭ বছর বয়সে হৃদ্রোগজনিত সমস্যায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। বলিউডের বড়োপর্দায় তাঁর পদার্পণ ১৯৫৭ সালে। ‘রোটি কাপড়া অউর মকান’, ‘পুরব অউর পশ্চিম’, ‘ক্রান্তি’-এর মতো ছবিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। মনোজ কুমার ১৯৯২ সালে পদ্মশ্রী, ১৯৯৯ সালে ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান।
সতীশ শাহ
চরিত্রাভিনেতা ও কৌতুক অভিনেতা সতীশ শাহ ২৫ অক্টোবর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ছোটোপর্দা এবং বড়োপর্দা, দুটোতেই সমান ভাবে অভিনয় করে গিয়েছেন সতীশ। ‘সারাভাই ভার্সেস সারাভাই’ সিরিজ, ‘হাম সাথ সাথ হ্যাঁয়’, ‘ম্যাঁয় হুঁ না’ এবং ‘জানে ভী দো ইয়ারো’-তে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল। ২৫ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান অভিনেতা। বয়স হয়েছিল ৭৪।
গোবর্ধন আসরানি
প্রবীণ অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী গোবর্ধন আসরানি, যিনি আসরানি নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন, দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৮৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন। ১৯৬৭-তে মুক্তি পাওয়া ‘হরে কাঁচ কী চোড়িয়াঁ’-তে অভিনয়ের মাধ্যমে আসরানির অভিনয়জীবনের সুত্রপাত। ‘শোলে’-তে জেলারের চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও জনপ্রিয় সংলাপের মাধ্যমে বেঁচে আছে। ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’, ‘বাওয়ার্চি’, ‘হেরা ফেরি’-সহ বহু ছবিতে তিনি দর্শকদের হাসিয়েছেন।
শেফালি জরিওয়ালা
একুশ শতকের শুরুতে ‘কাঁটা লাগা’ গানের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া অভিনেত্রী শেফালি জরিওয়ালা ২৭ জুন মাত্র ৪২ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বার্ধক্য-নিবারক একাধিক ওষুধ খালি পেটে খাওয়ার ফলে রক্তচাপ কমে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তিনি ‘বিগ বস ১৩’-এ অংশ নিয়ে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
পঙ্কজ ধীর
টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা পঙ্কজ ধীর, যিনি ‘মহাভারত’ ধারাবাহিকে কর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, ১৫ অক্টোবর ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর মারা যান। টেলিভিশনের পাশাপাশি তিনি ‘সোলজার’, ‘বাদশাহ’, ‘তুমকো না ভুল পায়েঙ্গে’-র মতো ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন।

(বাঁ দিক থেকে) পঙ্কজ ধীর, মুকুল দেব ও ঋষভ ট্যান্ডন।
মুকুল দেব
অভিনেতা মুকুল দেব ২৩ মে ৫৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন। তাঁর ভাই রাহুল দেব জানান, দীর্ঘদিন ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করার ফলেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ‘সন অফ সরদার’, ‘জয় হো’-সহ একাধিক ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন। এ ছাড়াও ‘ঘরওয়ালি উপরওয়ালি’, ‘কোশিশ’, ‘কুমকুম’ প্রভৃতি টিভি ধারাবাহিকে অভিনয় করে খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন।
সুলক্ষণা পণ্ডিত
অভিনেত্রী ও সুগায়িকা সুলক্ষণা পণ্ডিত ৬ নভেম্বর ৭১ বছর বয়সে মারা যান। অভিনয় ও সংগীত—দু’ক্ষেত্রেই তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তখন বয়স মাত্র ন’ বছর। ১৯৬৭ সালে ‘তকদির’ ছবিতে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ‘সাত সমুন্দর পার সে’ গেয়ে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। ছোটো বয়সে ওই গান গাওয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর কেরিয়ার শুরু। তার পর ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। হিন্দি, বাংলা, মরাঠি, ওড়িয়া ও গুজরাতি ভাষায় গান গেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন সুলক্ষণা। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘উলঝন’ ছবির মাধ্যমে বড়োপর্দায় আত্মপ্রকাশ। সুলক্ষণার ভাই বলিপাড়ার জনপ্রিয় সংগীতনির্মাতা যতীন এবং ললিত। তাঁর বোন বিখ্যাত অভিনেত্রী বিজয়েতা পণ্ডিত।
ঋষভ ট্যান্ডন
গায়ক-গীতিকার ও সুরকার ঋষভ ট্যান্ডন, যিনি মঞ্চনামে ‘ফকির’ নামে পরিচিত ছিলেন, ২২ অক্টোবর দিল্লিতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর আধুনিক ও সুফি প্রভাবিত গান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৫ বছর।
এই সব শিল্পীর প্রয়াণে ২০২৫ সাল ভারতীয় বিনোদন জগতের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে রইল। তাঁদের সৃষ্টি ও কাজ ভবিষ্যতেও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
