২০২৩ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন বলেছিলেন, ‘আমরা একজন সুপারস্টার পেয়েছি, রাকিব।’ বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তারকার মুখ থেকে এমন প্রশংসা পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এ বছর ১৯ নভেম্বর কথা হচ্ছিল আগের রাতেই ভারতকে হারানোর নায়ক শেখ মোরসালিনের সঙ্গে। দীর্ঘ আলাপের একপর্যায়ে এলো রাকিব প্রসঙ্গ। তার অ্যাসিস্টেই যে ২২ বছর পর দেশকে ভারতের বিপক্ষে জয় উপহার দিয়েছিলেন তিনি। রাকিবকে নিয়ে মোরসালিনের মন্তব্যটা ছিল এমন, ‘রাকিব ভাই সম্পর্কে যদি বলি, আমার মতে উনি বর্তমানে এশিয়ায় ওয়ান অব দ্য বেস্ট উইঙ্গার। ওনার মতো দ্রুতগতির উইঙ্গার এশিয়ায় নেই বললেই চলে। এটা আমাদের জন্য একটা বিরাট ব্যাপার। উনি মাঠে এবং প্র্যাকটিসে অনেক অ্যাফোর্ট দেন।’ সালাউদ্দিন তো বলেছেন। আক্রমণ সতীর্থের বলা কথাগুলোও যে প্রমাণ দিচ্ছে রাকিব সত্যি আলাদা।
এমনটা শুনতেই গতকাল শনিবার লাজুক হেসে না-সূচক জবাব দিলেন ২৫-এ পা রাখা রাকিব। বললেন, ‘আমি নিজেকে আলাদা মনে করি না। আমি অতি সাধারণ একজন। শুধু ফুটবল খেলাটাই খেলতে পারি। তাই চাই নিজের কাজটা ঠিকঠাক করতে।’ রাকিবের ভাষ্যটিও তাকে আলাদা করে পরিচয় করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের আক্রমণভাগের অন্যতম অস্ত্র রাকিব। রাইট উইং পজিশনে এ সময়ের তর্কাতীত সেরা। যদিও প্রায়ই তাকে ভিন্ন পজিশনে খেলতে হয় জাতীয় দল কিংবা ক্লাব কোচদের অনুরোধ রাখতে। তাতেও মানা নেই। ফরোয়ার্ড হিসেবে ভালোবাসেন অন্যকে দিয়ে গোল করাতে। তবে গোল করায়ও উনি বেশ পারঙ্গম। যার প্রমাণ শেষ হওয়া মৌসুম। দুবারই বিদেশিদের ভিড়ে নিজের গোল করার পারদর্শিতার ছাপ রেখেছেন। ২০২৩-২৪ মৌসুমে করেছেন ১০ গোল, যা স্থানীয়দের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর সব মিলিয়ে চতুর্থ সেরা। গোলের পাশাপাশি ২ অ্যাসিস্টে সেবার হয়েছিলেন লিগের সেরা খেলোয়াড়।
বসুন্ধরার হয়ে পরের মৌসুমেও গোলের মালা গেঁথেছেন রাকিব। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১১ গোলের পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৬ গোল। আর এবার মাত্রই গোলের খাতা খুলেছেন ষষ্ঠ রাউন্ডে। শুক্রবার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন মোহামেডানের বিপক্ষে ২-০ জয়ের প্রথমটা তার অসাধারণ ভলি থেকে আসা। তবে ছয় ম্যাচে পাঁচ অ্যাসিস্টে নিজের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।
শুধু ক্লাব ফুটবল নয়। রাকিব নিয়মিতই গোল করা ও করানোর কাজটা করে চলেছেন বাংলাদেশের জার্সিতে। তাই তো হামজা চৌধুরীর মতো বিশ্বমানের সতীর্থের ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠেছেন অল্পদিনেই। লাল-সবুজ জার্সিতে তার গোলসংখ্যা ছয়টি। বর্তমান দলে খেলাদের মধ্যে যৌথভাবে দ্বিতীয়।
রাকিব যে আলাদা আর বড় কারণটা এবার জানা যাক। বরিশাল সদরের চড়বাড়িয়ায় ছেলে রাকিব। কৌশলে ফুটবলে মজেছিলেন। তবে বাবা-মা চাইতেন পড়ালেখা করে রাকিব প্রতিষ্ঠিত হোক, হাল ধরুক পরিবারের। বাবা-মার চাওয়াটা তাদের মতো করে পূরণ করতে পারেননি। তবে হালটা ঠিকই ধরেছেন; সেটা ফুটবল খেলে। বরিশালের গণ্ডি পেড়িয়ে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান রাজধানীতে। পাইওনিয়ার, তৃতীয় বিভাগ, প্রথম বিভাগ পেড়িয়ে একসময় নাম লেখান বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে। দ্বিতীয় পেশাদার লিগে পুলিশ দলের হয়ে কিছুদিন খেলেই নজর কাড়েন অভিজ্ঞ কোচ সৈয়দ গোলাম জিলানীর। বসুন্ধরা কিংসের সহকারী কোচ সে সময় ছিলেন ভিক্টোরিয়া ক্লাবের দায়িত্বে। পরের মৌসুমে জিলানী রাকিবকে নিয়ে আসেন নিজের দলে। পরের মৌসুমে জিলানীর হাত ধরেই তিনি শীর্ষ লিগে পা রাখেন রহমতগঞ্জ দলে। সময় নিয়েছেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। প্রতিষ্ঠিত হয়েই রাকিব এসেছেন সেরা দলে এবং অবশ্যই সেরা হয়ে।
তিনি আলাদা আরও অনেক কারণেই। রাকিবকে নিয়ে কখনো স্ক্যান্ডাল রটেনি। মাঠের বাইরের কোনো অঘটনে জড়ায়নি তার নাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ওঠেনি সমালোচনার ঝড়। ফুটবলের এ অস্তাচল যাত্রায় রাকিব এক আলোকবর্তিকা। সালাউদ্দিনের কথায় ‘সুপারস্টার’।
