নানা সংকটে দেশের সংগীতাঙ্গন। গত সপ্তাহে বাংলাদেশের তরুণ নেতা ওসমান হাদির মৃত্যুর পর থেকে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি। ভাঙচুর, তাণ্ডবের কবল থেকে রেহাই পায়নি ছায়ানট, উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও। এ পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার রাতে হামলা এবং ইটবৃষ্টির জেরে জেমসের অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে যাওয়ায় আবার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনের শেষ ভাগে ‘নগর বাউল’ খ্যাত দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা জেমসের গান পরিবেশের কথা ছিল। কিন্তু বহিরাগতদের হামলায় অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়।
এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন দেশের সংগীতাঙ্গন। বিস্ময় প্রকাশ করেন জেমস নিজেও। এই ব্যান্ডতারকা বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ আয়োজকদের অব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতা। নিরাপত্তা ও দর্শক ব্যবস্থাপনায় বড় ঘাটতি ছিল।’ পাশাপাশি জেমসের ব্যক্তিগত সহকারী রবিন ঠাকুর পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমরা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ফরিদপুর পৌঁছাই। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই শুনি সেখানে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। তখন আমরা গেস্ট হাউজেই ছিলাম। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালে আমাদের জানানো হয় অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। এরপরই ঢাকায় ফিরে আসি।’
অনুষ্ঠানস্থল থেকে ঢাকায় ফিরে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে উপস্থাপক শ্রাবণ্য তৌহিদা জানান, সন্ধ্যার পর। তখন মঞ্চে র্যাফেল ড্র চলছিল। এরপরই মূল চমক নগর বাউল জেমস গান পরিবেশনের কথা। এমন সময় হঠাৎ বৃষ্টির মতো পাথর ও ইট পড়তে শুরু করে স্টেজের দিকে। ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে শ্রাবণ্য বলেন, ‘হঠাৎ একটি বড় পাথর ঠিক আমার সামনে এসে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে সব বদলে গেল। এক বুক আশা আর ভালোবাসা নিয়ে আসা মানুষের চোখেমুখে তখন শুধু আতঙ্ক।’ এই সঞ্চালক আরও জানান, ‘প্রায় ১৫ হাজার মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল আয়োজকরা। ইটের আঘাতে অনুষ্ঠানস্থলেই প্রায় ১৫ জন শিক্ষার্থীসহ অনেকে রক্তাক্ত হন। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা এমন পরিস্থিতির পর নিরাপত্তার স্বার্থে অনুষ্ঠানটি পণ্ড ঘোষণা করতে বাধ্য হন আয়োজকরা।’
বিষয়টি নিয়ে কথা হয়, দেশের কয়েকজন সংগীতশিল্পীর সঙ্গে। তারা দুঃখ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল, সেটি হলো না। এটা সত্যিই খুব দুঃখজনক। কনসার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া আমাদের জন্য মোটেও ভালো সংবাদ নয়। আমরা যারা পারফর্ম করি, গান গাই, আমাদের জন্য এগুলো হতাশার খবর। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বারবার কনসার্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক-দুটি অনুষ্ঠান কালেভদ্রে হলেও বেশির ভাগ ওপেন শো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তাজনিত কারণে। এটা শিল্পী সমাজের জন্য খুবই খারাপ সিগন্যাল। আমাদের কালচারের ওপর এ ধাক্কা নিঃসন্দেহে একটি খারাপ সংকেত।’
এই বিষয়ে সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। যারা এর ওপর ভর করে জীবনধারণ করেন, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’ সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবীও হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতি একটু এলোমেলো। আমরা যে যেই সেক্টরে আছি, এ পরিস্থিতি নিয়ে সবাই এক ধরনের চিন্তার ভেতর আছি। আমাদের প্রত্যাশা, সব জায়গায় সবকিছু দ্রুত স্থিতিশীল হোক। শিল্পীদের লক্ষ্যই সৌন্দর্যের দিকে, শিল্পী সমাজ সবসময় মানুষকে বিনোদন দেয়। শিল্পীরা তো দর্শক-শ্রোতাদের জন্যই কাজ করেন।’
সংগীতশিল্পী পুলক অধিকারী বলেন, ‘কিছু জায়গায় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কায় প্রোগ্রামের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না, আবার কোথাও কোথাও এলাকার মানুষ কনসার্টে বাধা দিচ্ছে।’
