কবি সুনির্মল বসু বলেছেন, ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’। জীবনের চারদিকে জ্ঞানের এত এত প্রকরণ রয়েছে, যেকোনো চক্ষুষ্মান ব্যক্তি স্বীকার করতে বাধ্য হবেন, এই পৃথিবীটাই একটা শিক্ষালয় আর এই পৃথিবীর প্রতিটি উপাদান অনুচ্চ স্বরে দিনরাত আমাদের নানা কিছু শিখিয়ে চলেছে। আজ এমন কয়েকজন শিক্ষকের কথা বলব, যারা প্রচলিত অর্থে শিক্ষক নন কিন্তু তারা হাসতে হাসতে অল্পকথায় নানা কিছু আমাদের শিখিয়েছেন। তারা আমাদের শিখিয়েছেন গল্পে গল্পে। তাদের শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাদের এই গল্পগুলো যেকোনো বয়সী মানুষের উপযোগী। বড়রা তাদের গল্পে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষণীয় উপাদান খুঁজে পান তো বটেই, শিশু-কিশোররাও গল্পের মজা উপভোগ করার সঙ্গে সঙ্গে মনের অজান্তেই গেঁথে নেয় নানা শিক্ষণীয় বিষয়, যেগুলো পরবর্তী জীবনেও কাজে লাগে নানাভাবে।

গোপাল ভাঁড়

এই অপ্রচলিত শিক্ষকদের মধ্যে সবার আগে যে নামটি আসে তিনি গোপাল ভাঁড়। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার সভাসদ ছিলেন গোপাল ভাঁড়। তৎকালীন রাজদরবারে ভাঁড় পদে একজন সভাসদ থাকতেন, যিনি তার রসিকতা দ্বারা রাজদরবারের উত্তেজনাময় পরিস্থিতি শান্ত করতে সাহায্য করতেন। গোপাল ভাঁড় শুধু রসিকতার মাধ্যমে মহারাজকে হাসাতেন না, বরং কৌশলে মহারাজের বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদও করতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মহারাজ এক শীতকালে ঘোষণা করলেন রাজবাড়ির সামনের পুকুরে যে সারারাত গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে থাকতে পারবে, তাকে তিনি স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেবেন। পুরস্কারের লোভে অনেকে চেষ্টা করে ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পেরে রণে ভঙ্গ দিল। এক হতদরিদ্র ব্যক্তি এই কঠিন পরীক্ষা পাস করল এবং পুরস্কার দাবি করল। তখন রাজসভার ঈর্ষান্বিত কয়েকজন সভাসদ রাজাকে বোঝালেন, কেউ পারল না আর এই ব্যক্তি পারল কীভাবে? সওয়াল-জওয়াব করা যাক! মহারাজ সম্মত হলেন। প্রশ্ন করে জানা গেল, ওই ব্যক্তি গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে থেকে রাজবাড়ির একটি প্রদীপের দিকে তাকিয়ে ছিল। তখন সভাসদরা জানালেন, রাজবাড়ির ওই প্রদীপের উত্তাপেই ওই ব্যক্তি পানিতে থাকতে পেরেছে। ফলে সে পুরস্কারের দাবিদার হতে পারে না। মহারাজ তাদের কথা শুনে ওই ব্যক্তির পুরস্কার বাতিল করে দিলেন। মনের দুঃখে লোকটি গোপালের দ্বারস্থ হলো। গোপাল সব শুনে মহারাজকে বোঝানোর জন্য একটি বুদ্ধি করলেন। তিনি একদিন সকালে গাছের মাথায় চালের হাঁড়ি চড়িয়ে গাছের নিচে একটি প্রদীপ জ¦ালিয়ে ভাত রান্না করা শুরু করলেন। রাজসভায় গোপাল অনুপস্থিত দেখে মহারাজ খোঁজ নিতে পাঠালেন। পেয়াদা এসে দেখল, গোপাল গাছে চড়ে ভাত রান্না করছেন। গোপালকে রাজসভায় যেতে বললে গোপাল উত্তর দিলেন, মহারাজকে বলো ভাত চড়িয়েছি। ভাত হলেই খেয়ে রাজসভায় যাব। মহারাজ গোপালের কাণ্ড দেখে নিজে খোঁজ নিতে এলেন। মহারাজকে দেখেও গোপাল গাছ থেকে নেমে এলেন না। গোপাল ওপর থেকে বললেন, মহারাজ ভাত চড়িয়েছি। রান্না হলেই নামছি। তখন মহারাজ রেগে বললেন, গোপাল তুমি কি পাগল হলে? গাছের নিচের প্রদীপের উত্তাপে কি গাছের ওপরে থাকা চাল রান্না হয়ে ভাত হয়? গোপাল তখন হেসে বললেন, যদি রাজবাড়ির প্রদীপের আলোয় পুকুরের পানি গরম হয়, তাহলে প্রদীপের তাপে গাছের মাথার হাঁড়ির চাল রান্না হবে না কেন? মহারাজ গোপালের কথার যুক্তি বুঝলেন এবং তার ভুল স্বীকার করলেন। দরিদ্র ব্যক্তিটিকে ডেকে পুরস্কার বুঝিয়ে দিলেন।  যেখানে শক্তি বা যুক্তিতর্ক বৃথা, সেখানে গোপাল ভাঁড় নিজের উপস্থিত বুদ্ধিতে অন্যের উপকার করতেন। বুদ্ধি ও সদিচ্ছা থাকলে দুর্বলের সহায় হওয়া যায় সে শিক্ষা আমরা গোপাল ভাঁড়ের কর্মকাণ্ড থেকে পাই। গোপাল ভাঁড়ের প্রতিটি গল্পই এমন নানা ধরনের শিক্ষা দ্বারা সমৃদ্ধ।

নাসিরুদ্দিন হোজ্জা

নাসিরুদ্দিন হোজ্জার গল্পও আমাদের দেশে প্রচলিত। নাসিরুদ্দিন হোজ্জা রাজার কর্মচারী ছিলেন না। তবে একবার কাজীর দায়িত্ব পালন করেছেন বলে গল্পে উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন তুরস্কের অধিবাসী। পশুপালনসহ নানা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সন্তান-সন্ততির কথা জানা যায় না, স্ত্রীকে নিয়েই তার গার্হস্থ্য জীবন। আরবিভাষী বণিকরা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার গল্পগুলো সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তিনি মোল্লা নাসিরুদ্দিন নামেও পরিচিত। অন্যায়ের প্রতিবাদে যে হোজ্জা কম যান না, তা নিচের গল্পটি থেকে বোঝা যায়। একদিন নাসিরউদ্দিন হোজ্জা একটি খাবারের দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। যথেষ্ট টাকা না থাকায় খাবার কিনতে পারছিলেন না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাবারের ঘ্রাণ নিচ্ছিলেন। দোকান মালিক এটা দেখে তার কাছে টাকা দাবি করলেন। হোজ্জা তখন তার টাকার থলির মধ্যে যে দু-একটি টাকা ছিল, সেটির শব্দ শুনিয়ে বললেন, সুবাসের যদি মূল্য থাকে, তাহলে টাকা শব্দেরও মূল্য আছে। খাবারের সুবাসের মূল্য টাকার শব্দ। চালাকি করে যে জেতা যায় না, সেটি হোজ্জা তার গল্পের মাধ্যমে বারবার দেখিয়েছেন।

ঈশপ

ঈশপ জন্মগ্রহণ করেছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব ৬২০ সালে। প্রথম জীবনে ছিলেন ক্রীতদাস পরে মুক্ত হয়ে যোগ দিয়েছিলেন মরোক্কোর রাজসভায়। জন্মস্থান সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

মিথ্যাবাদী রাখালের গল্প কে না জানে। ঈশপের গল্প দ্বারা আমরা জানতে পারি, সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। মিথ্যাবাদী রাখালের গল্প থেকে আমরা জানতে পারি, অন্যকে প্রতারিত করলে যখন আমরা সত্যি সত্যি বিপদে পড়ব, তখন কেউ সাহায্য করতে আসবে না। অতিলোভে মৃত্যু, লাফ দেওয়ার আগে দেখে নাও, দুর্জনের মিষ্টি কথায় ভুলো না এমনই কত উপদেশ যে গল্পে গল্পে ঈশপ আমাদের জানিয়েছেন, তার শেষ নেই।

বীরবল

বীরবল ছিলেন বাদশাহ আকবরের নবরতেœর একজন। বীরবল তার অতুল বুদ্ধি দিয়ে জনসাধারণের জন্য যতটুকু করা সম্ভব, তা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কৃতিত্ব কখনোই নিজে নেননি। আকবরের বদান্যতা হিসেবে মানুষের মধ্যে প্রচার করেছেন। এর ফলে আকবরের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। আকবরের সঙ্গে বীরবলের প্রথম দেখাটাও স্মরণীয়। বাদশাহ আকবরের দরবারে ঘুষের এমন প্রাদুর্ভাব হয়েছিল, সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বীরবল যখন রাজদরবারে একটি খবর নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেন, তখন তিনি এই ঘুষ দেওয়ার প্রথা সমূলে উৎপাটনের চিন্তা করলেন। বীরবলের খবরে আকবর খুশি হলে বিনিময়ে কী পুরস্কার চান তা জিজ্ঞেস করলে বীরবল বলেন, তিনি পঁঞ্চাশ ঘা বেত্রাঘাত দাবি করলেন। বাদশাহ যতই অন্য পুরস্কার দিতে চান, তিনি ততই আবেদন করেন তাকে যেন বেত্রাঘাত করা হয়। শেষ পর্যন্ত বীরবলের দাবি মঞ্জুর হলো। পঁচিশ ঘা বেত মারার পর বীরবল থামতে বললেন, আকবরকে জানালেন তার পুরস্কারের আরেকজন ভাগীদার আছেন। কে সেই ভাগীদার জিজ্ঞেস করলে বীরবল জানালেন, তিনি যখন রাজদরবারে আসতে চেয়েছিলেন, প্রধান ফটকের রক্ষী তাকে আসতে দিতে চায়নি। প্রাপ্ত পুরস্কারের অর্ধেক তাকে দেওয়া হবে এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে তবেই তাকে আসতে দিয়েছে সেই রক্ষী। এখন তাহলে তাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হোক। আকবর কথাটি শুনে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলেন এবং সেই রক্ষীকে ডেকে ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলেন। বাদশাহর ক্রোধ দেখে সে স্বীকার করল, সে সবার কাছ থেকেই এমন ঘুষ নেয়। বাদশাহ তাকে চরম শাস্তি দিলেন এবং বীরবলকে নিজের দরবারে ঠাঁই দিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বীরবল নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও অন্যায়টি তার সামনে আনার চেষ্টা করবে। এতে তিনি রাজ্যের সঠিক অবস্থা জানতে পারবেন।

এই অপ্রচলিত শিক্ষকদের গল্পের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, গল্পগুলো ছোট, রসময় এবং অন্তর্নিহিত উপদেশসমৃদ্ধ। এ কারণে অন্যের গল্প আরেকজনের নামেও প্রচলিত হতে দেখা যায়। গোপাল ভাঁড়ের গল্প বীরবলের নামে আবার বীরবলের গল্প নাসিরুদ্দিন হোজ্জার নামে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রচলিত হয়ে আসছে। যার নামেই প্রচারিত হোক না কেন, গল্পগুলো একইভাবে জীবন সম্পর্কে প্রতিনিয়ত আমাদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।

লেখক : সাহিত্যিক





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *