১৮ ডিসেম্বর। শহরে নেমেছে গভীর রাত। বারোটা ছুঁয়েছে ঘড়ির কাঁটা। ঠিক তখনই হলো গণমাধ্যমের ওপর ভয়াবহ হামলা। এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি ছিল সচেতন, পরিকল্পিত ও বার্তাবহ অপরাধ। স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সত্য উচ্চারণের ওপর সরাসরি হামলা। কখনো এটি কেবল ইট-পাথরের ওপর আঘাত নয়। বিবেক ও সত্যের ওপরও আঘাত। কখনো কখনো রাষ্ট্রের ক্ষমতা অন্ধ হয়। শাসনের নামে চলে অন্যায়-অবিচার। রুদ্ধ হয় নাগরিকের কণ্ঠ। আর তখনই গণমাধ্যম প্রশ্ন তোলে, কেন? কাদের জন্য? কার স্বার্থে? সংবাদপত্র ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। ফলে কেউ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। গণমাধ্যম শুধু প্রতিবাদের মঞ্চ নয়। এটি মানুষের কণ্ঠস্বর। লাখো মানুষের জীবিকার আশ্রয়। এই মানুষগুলো শুধু কর্মী নয়। তারা সমাজের নীরব যোদ্ধা। ঝুঁকি নিয়ে, চাপ ও হুমকির মুখে নিরন্তর সত্য বলে য়ায়। এই হামলার ফলে সাংবাদিকদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। রুটিরুজির প্রশ্নকে ঠেলে দেওয়া হলো, সংকটের মুখে।

গণমাধ্যম একদিকে সংবাদ পরিবেশন করে আবার একই সঙ্গে সত্যেরঅনুসন্ধান করে। দুর্নীতি, লুটপাট, নিপীড়নসহ বিভিন্ন অনিয়মের খবর প্রকাশ করে। খবর প্রকাশের সঙ্গে নানা অনিয়মের প্রশ্ন তোলে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শেখায়। মাথা উঁচু করে সত্য উচ্চারণ করতে শেখায়। আর তাই সাংবাদিকতা শুধু একটা পেশা নয়, এটা এক  নৈতিক দায়িত্ব। গণমাধ্যম সবসময় সত্য-ন্যায়ের পক্ষে; রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের মধ্যে সেতু তৈরি করে। আবার একজন নির্যাতিত শ্রমিকের কান্না, নিখোঁজের আর্তনাদ ও  গুম হওয়া মানুষের পরিবারগুলোর নিরাপত্তহীনতা তুলে ধরে। তখন শাসক প্রশ্নের মুখে পড়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। আর এখানেই গণমাধ্যমের সফলতা। একেকটি প্রতিবেদন যেন নাগরিকের অধিকার রক্ষার দলিল। একেকটি সম্পাদকীয় যেন একটি মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের দিকনির্দেশনা। এই মত প্রকাশে যারা বাধা সৃষ্টি করতে চায়, তারা গণতন্ত্র, মানবতাকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা বোঝার উপায় হলো সে সমাজের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন ও সহসী। যেখানে গণমাধ্যম ভীত, সেখানে মানুষ পরাধীন। যেখানে গণমাধ্যম স্বাধীন, সেখানে মানুষ আশাবাদী। গণমাধ্যম তাই কেবল কাগজ, স্ক্রিন বা শব্দ নয়, এটি এক নৈতিক অবস্থান। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রতীক। মানুষের মুক্তির পক্ষে উচ্চারিত এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। হামলাকারী হয়তো ভেবেছে সব আগুনে জ¦ালিয়ে, ভেঙেচুরে একাকার করলে কলম থেমে যাবে। সত্য চাপা পড়বে। কিন্তু তারা জানে না, সত্য কখনো নত হয় না। এই দেশ একাত্তর দেখেছে। এই মাটি জানে, অস্ত্র দিয়ে আদর্শকে পরাজিত করা যায় না। ভয় দেখিয়ে বিবেককে বন্দি করা যায় না। সংবাদপত্র সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। এখানে সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়। এটি এক নৈতিক দায়। একটি মানবিক শপথ।

প্রশ্ন উঠছে, দেশে কি সত্য বলার নিরাপত্তা নেই! ভিন্নমত কি অপরাধ? গণতন্ত্র কি শুধু কাগজে লেখা একটি শব্দ? এই প্রশ্ন শুধু সংবাদপত্রের জন্য নয়। এটি আজ পুরো জাতির প্রশ্ন। ১৮ ডিসেম্বর গভীর রাতে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার আক্রান্ত হয়েছে। আগামীকাল যে অন্য পত্রিকা আক্রান্ত হবে না এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ দেশের কোনো সংবাদপত্র অপশক্তির কাছে হেরে যাবে না। কারণ সত্য, ন্যায়, স্বপ্ন, কোনো ভবনে বন্দি থাকে না। আলো থাকে অন্তরে। আর সেই আলো রচনা করে চিরকালীন সুন্দরের পথ। সংবাদপত্র জীবন ও সমাজের মেরুকরণে পথ দেখায়। একজন চিত্রশিল্পী যেমন রংতুলি দিয়ে ছবি আঁকেন তেমনি কয়েকশ সংবাদকর্মী তাদের মেধা-মননে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় পাঠকের জন্য একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। গণমাধ্যম মানুষকে একাত্ম করে। উন্মেষ ঘটে নতুন বোধের, নতুন চিন্তার। তাই এই সর্বগ্রাসী তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও সংবাদপত্র টিকে আছে। সংবাদপত্র একটি জাতির আত্মার আলো, হৃদয়ের ভাষা। প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের জেল-জুলুম, নির্যাতন, নিপীড়নের ভয় থাকে। মৃত্যুর ভয় থাকে। সম্প্রতি শেষ হওয়া গাজা যুদ্ধে ইসরায়েল প্রায় ৩০ জন সাংবাদিককে হত্যা করেছে। আজও আমরা ভুলিনি সাগর-রুনিকে। এই সাংবাদিকরা যা উচ্চারণ করেন, যা লেখেন অন্যরা তা উচ্চারণ করতে, লিখতে ভয় পান। গণমাধ্যমের কাজ সত্য অনুসন্ধান। জনগণকে সঠিক তথ্য জানানো। হামলাকারীরা সেই সত্য আড়াল করতে চায়। দেশের মানুষকে মিথ্যা বলে বিভ্রান্ত করতে চায়। কিন্তু পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই যে, গণমাধ্যমকে সত্যের পথ থেকে সরাতে পারে। প্রকৃত সাংবাদিকের শক্তি এখানেই যে, সে সত্যকে বিক্রি করে না। ক্ষমতার কাছে নত হয় না। মানুষের পাশে থাকে।

আবার গণমাধ্যম কোনো রোবট নয় যে, এর ভুল হয় না। গণমাধ্যমেরও ভুল হতে পারে। সে নিজের সমালোচনা করে। ভুল শুধরে নেয়। এটাই তার সৌন্দর্য। যতদিন পৃথিবীতে মানুষ থাকবে, ততদিন গণমাধ্যমে থাকবে। যে চেহারাতেই থাকুক। গণমাধ্যমের সত্য, সহসী উচ্চারণ থাকবেই। এর মূল কারণ হচ্ছে একটি দেশের অধিকাংশ মানুষের সুখ, দুঃখ, কষ্ট, বেদনা এবং মুক্তি ও স্বপ্ন, সত্যের কথা একমাত্র গণমাধ্যমই বলে। আর চলমান রাজনীতি? প্রকৃত তথ্য আর কোথায় জানা যায় গণমাধ্যম ছাড়া? আমাদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী মানুষ থাকবে। সবার মত এক হবে এমনটি কেউ ভাবে না। কারণ, এটি কখনো সম্ভব নয়। কিন্তু ভিন্ন মত এবং পথকে যদি আমরা সম্মান এবং ভালোবাসতে না পারি তাহলে আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে তাল মেলানো সম্ভব নয়, আমরা পিছিয়ে পড়ব। সেই পশ্চাৎপদ প্রজন্ম একদিন আমাদেরকেই প্রশ্ন করবে কঠোর ভাষায়। সেই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই।

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও সংগঠক

[email protected]





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *