ক্ষমতা কখনো মানুষকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেয়, আবার কখনো তাকে ভয়াবহ পতনের দিকে ঠেলে দেয়। কোরআন মানুষের এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়েছে। তাই সেখানে ক্ষমতা, নেতৃত্ব ও শাসনের প্রশ্নে নীতিগত দিকনির্দেশনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কোরআনের বর্ণনায় ন্যায়পরায়ণ শাসক হবেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থের হাতিয়ার না বানিয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন। তার শাসনে প্রতিফলিত হয় ন্যায়, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও আল্লাহভীতি। কোরআনের বর্ণনায় ন্যায়পরায়ণ শাসকের বৈশিষ্ট্যগুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হলো।
আল্লাহমুখিতা : একজন আদর্শ শাসকের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহমুখিতা। হজরত সুলাইমান (আ.) বিপুল রাজত্ব ও ক্ষমতা লাভের পরও বলতেন, ‘নিশ্চয়ই এটি আমার রবের সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।’ (সুরা নামল, আয়াত ১৬) মহান আল্লাহ তার এই গুণের প্রশংসা করে বলেন, ‘সে ছিল উত্তম বান্দা। নিশ্চয়ই সে ছিল অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী।’ (সুরা সাদ, আয়াত ৩০) ক্ষমতা যেন শাসককে অহংকারী না বানায়, বরং মহান আল্লাহর নিকট বেশি বিনয়ী ও জবাবদিহিমুখী করে, এটিই কোরআনের শিক্ষা।
ন্যায়বিচার করা : হজরত দাউদ (আ.)-কে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘সুতরাং তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার করো এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।’ (সুরা সাদ, আয়াত ২৬) ন্যায়বিচার শাসনের প্রাণ। ধনী-দরিদ্র, শক্তিশালী-দুর্বল, পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সবার প্রতি সমান ন্যায়বিচার করা শাসকের অপরিহার্য দায়িত্ব।
শৃঙ্খলা বজায় রাখা : হজরত মুসা (আ.) তার ভাই হারুন (আ.)-কে দায়িত্ব দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি সবকিছু সংশোধন করবে এবং ফাসাদকারীদের অনুসরণ করবে না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত ১৪২) শাসকের দায়িত্ব সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সব প্রকার অনাচার ও বিশৃঙ্খলা দূর করা।
অপরাধীদের শাস্তি প্রদান : জুলকারনাইনের ঘটনায় মহান আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ শাসনের একটি মৌলিক নীতি শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘যে সীমালঙ্ঘন করবে, আমরা তাকে শাস্তি দেব। অতঃপর তাকে তার রবের নিকট ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তখন তিনি তাকে কঠিন আজাব দেবেন। আর যে ইমান আনবে ও সৎকর্ম করবে, তার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত ৮৭-৮৮) এটিই ন্যায়পরায়ণ শাসনের ভিত্তি। সৎলোকের পৃষ্ঠপোষকতা ও অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি।
জনসেবা করা : জুলকারনাইন ইয়াজুজ-মাজুজের অত্যাচার থেকে জনগণকে রক্ষা করতে প্রাচীর নির্মাণের প্রস্তাব পান। জনগণ বিনিময়ে অর্থ দিতে চাইলে তিনি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আমার রব আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, সেটাই আমার জন্য শ্রেয়।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত ৯৫) প্রকৃত শাসক জনসেবাকে ইবাদত মনে করেন এবং মহান আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতাকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেন।
আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা : প্রাচীর নির্মাণের সফলতা লাভের পর জুলকারনাইন বলেন, ‘এটি আমার রবের রহমত।’ (সুরা কাহফ, আয়াত ৯৮) ক্ষমতার সাফল্যে অহংকার নয়, বরং বিনয় ও মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাই মুমিন শাসকের বৈশিষ্ট্য।
যোগ্যতা ও জ্ঞান : হজরত ইউসুফ (আ.) দেশের অর্থনৈতিক সংকটকালে বাদশাহকে বলেন, ‘আপনি আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্ব দিন। আমি রক্ষণাবেক্ষণে সক্ষম ও জ্ঞানসম্পন্ন।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত ৫৫) শাসক বা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও আমানতদারিতা থাকা আবশ্যক।
লোভ ত্যাগ করা : রানী বিলকিসের পাঠানো মূল্যবান উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করে হজরত সুলাইমান (আ.) বলেন, ‘তোমরা কি ধন-সম্পদ দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদের দেওয়া সম্পদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা নামল, আয়াত ৩৬) ন্যায়পরায়ণ শাসক কখনো ঘুষ, উপঢৌকন বা অন্যায় সুবিধার বিনিময়ে নিজের নীতিকে বিক্রি করেন না।
আমানতদারিতা : মহান আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন, আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৫৮) শাসনক্ষেত্রে আমানতদারি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রতিটি দায়িত্বশীল ব্যক্তির কর্তব্য।
কোরআন-সুন্নাহ মেনে শাসনকার্য পরিচালনা: একজন মুমিন শাসকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো মহান আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করা। মহান আল্লাহ নির্দেশ দেন, ‘আপনি তাদের মধ্যে বিচার করুন সেই বিধান অনুসারে, যা আল্লাহ নাজিল করেছেন।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৮) এর বিপরীত পথকে কোরআন ‘জাহেলিয়াতের শাসন’ বলে ঘোষণা করেছে।
কোরআনের আলোকে ন্যায়পরায়ণ শাসকের বৈশিষ্ট্যগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ইসলামে শাসন মানে নিছক কর্র্তৃত্ব নয়, বরং তা একটি কঠিন পরীক্ষা ও আমানত। আল্লাহমুখিতা, ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা, জনসেবা, জবাবদিহি ও আমানতদারিতা এই গুণগুলোর সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা। কোরআন আমাদের শেখায়, ক্ষমতার সাফল্য পরিমাপ হয় মানুষের কল্যাণে তার প্রভাব দিয়ে, ব্যক্তিগত লাভ দিয়ে নয়। এই শিক্ষাগুলো যদি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে নেতৃত্ব ও শাসন শান্তি, সুবিচার ও কল্যাণের উৎসে পরিণত হবে। কোরআনের এই নীতিমালা অনুসরণই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে ন্যায়পরায়ণ শাসক ও দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
