বিশ্বের প্রাচীনতম ভূতাত্ত্বিক পর্বতশ্রেণিগুলির অন্যতম অরাবল্লি পাহাড়-এর নতুন সংজ্ঞা ঘিরে উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্যে শুরু হয়েছে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত সংজ্ঞা গ্রহণ করেছে, যার ফলে অরাবল্লি পাহাড়কে নতুনভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের পরই পরিবেশবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, পার্শ্ববর্তী ভূমির তুলনায় কমপক্ষে ১০০ মিটার উচ্চতার যে কোনও ভূমিরূপকে অরাবল্লির পাহাড় হিসেবে ধরা হবে। পাশাপাশি, ৫০০ মিটারের মধ্যে থাকা দুই বা ততোধিক পাহাড় এবং তাদের মধ্যবর্তী জমিকেও অরাবল্লি পর্বতশ্রেণির অংশ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই সংজ্ঞা গ্রহণ করেছে আদালত।
পরিবেশবিদদের দাবি, শুধুমাত্র উচ্চতার ভিত্তিতে অরাবল্লিকে সংজ্ঞায়িত করা হলে বহু নিম্ন উচ্চতার, ঝোপঝাড়ে ঢাকা কিন্তু পরিবেশগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাহাড় সুরক্ষার বাইরে চলে যাবে। এর ফলে খনন ও বাণিজ্যিক নির্মাণের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়বে।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত সপ্তাহান্তে গুরুগ্রাম, উদয়পুর-সহ একাধিক শহরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভে স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক, পরিবেশকর্মী, আইনজীবী ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
‘পিপল ফর অরাবল্লিস’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নীলম আহলুওয়ালিয়া বলেন, অরাবল্লি পর্বতশ্রেণি মরুকরণ রোধ, ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁর মতে, নতুন সংজ্ঞা এই প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে দুর্বল করে দিতে পারে।
পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মী বিক্রান্ত টোঙ্গাদ বলেন, “বিশ্বের কোথাও পাহাড় বা পর্বতশ্রেণিকে শুধুমাত্র উচ্চতার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হয় না। এর ভূতাত্ত্বিক গঠন, পরিবেশগত ভূমিকা ও জলবায়ু সুরক্ষার ক্ষমতাকেও বিবেচনায় নিতে হয়।” তিনি সতর্ক করেন, এই সংজ্ঞা খনন ও নির্মাণকে উৎসাহিত করতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও সরব হয়েছে। সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব বলেন, “অরাবল্লি রক্ষা করা দিল্লির অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।” রাজস্থান কংগ্রেসের নেতা টিকা রাম জুলি অরাবল্লিকে রাজ্যের “লাইফলাইন” বলে উল্লেখ করেন।
তবে কেন্দ্রীয় সরকার ও পরিবেশ মন্ত্রক এই উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, নতুন সংজ্ঞার উদ্দেশ্য নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা এবং রাজ্যভেদে একরকম নিয়ম চালু করা। কেন্দ্রের দাবি, এই সংজ্ঞা অরাবল্লির ঢাল, পার্শ্ববর্তী জমি ও পাহাড়ের সংযোগ অঞ্চলকেও সুরক্ষার আওতায় আনে।
কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব জানান, প্রায় ১ লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত অরাবল্লি অঞ্চলের মাত্র ২ শতাংশ এলাকায়, কঠোর সমীক্ষা ও অনুমোদনের পরে খননের সম্ভাবনা রয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল, ইকো-সেনসিটিভ জোন ও জলাভূমিতে খনন নিষিদ্ধই থাকবে বলেও স্পষ্ট করেছে সরকার।
তবু আন্দোলনকারীদের একাংশ জানিয়েছে, তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন এবং প্রয়োজনে আইনি পথেও এই সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করবেন। অরাবল্লি রক্ষার লড়াই আরও দীর্ঘ হতে চলেছে বলেই মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
