ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ওসমান হাদির মৃত্যুর পর থেকেই অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার রাতভর তাণ্ডবের পর শুক্রবার সকালেও রাজধানী ঢাকা-সহ খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের একাধিক এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বিক্ষিপ্ত ভাবে বিক্ষোভ চলছেই, যদিও নতুন করে বড়সড় ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেনি।
এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে চলে এসেছে বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ভোট হওয়ার কথা। কিন্তু তার আগেই যেভাবে জনতার বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে নির্বিঘ্নে নির্বাচন হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নির্বাচনী আধিকারিক ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু বলা হয়নি, তবে কমিশনের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘কালের কণ্ঠ’ জানিয়েছে, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কমিশনের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার সকাল থেকে ঢাকার শাহবাগ চত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন বহু মানুষ। পাশাপাশি, আগুনে পুড়ে যাওয়া সংবাদপত্র ‘ডেলি স্টার’-এর দফতরের সামনেও হামলার প্রতিবাদে জমায়েত হয়। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ডেলি স্টার অফিসের নীচের দু’টি তলা সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময়েও ভিতরে দগ্ধ ও ভাঙাচোরা আসবাবপত্র পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। বাইরে পুলিশ ও র্যাবের কড়া প্রহরা ছিল।
ঢাকার কারওয়ান বাজারে সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’-র দফতরও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। শুক্রবার সকালেও ভবনের কয়েকটি অংশ থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখা যায়। গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ক্যামেরা ও লেন্স চুরি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে শুক্রবার সকাল থেকেই শাহবাগ-সহ ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসিয়ে যানচলাচল বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। গুলশান এলাকায় বিভিন্ন দূতাবাসের আশপাশেও বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
এই ঘটনার পর অবশেষে মুখ খুলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। শুক্রবার সকালে ইউনূসের প্রেস উইং থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে ‘প্রথম আলো’ এবং ‘ডেলি স্টার’-এর দফতরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর রাতেই দুই সংবাদপত্রের সম্পাদকের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ইউনূস। তিনি তাঁদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর হামলার নিন্দা করেছেন বলে ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ দিকে, শুক্রবার সকালে শাহবাগ মোড়ে বিক্ষিপ্ত ভাবে মিছিল করে স্লোগান দিতে দেখা যায় একদল বিক্ষোভকারীকে। সকলেরই দাবি—ওসমান হাদি হত্যার বিচার চাই। সংবাদমাধ্যম ‘বিবিসি বাংলা’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের বেশির ভাগই দাবি করেছেন, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। সকাল ১০টার পর থেকে ধীরে ধীরে শাহবাগ চত্বরে প্রায় শ’দুয়েক মানুষ জমায়েত করেন। নতুন করে যাতে কোনও অশান্তি না ছড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বৃহস্পতিবার রাতের তাণ্ডবের রেশ শুক্রবারও কিছু এলাকায় দেখা গিয়েছে। সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ভাঙা বাড়িতেও ফের ভাঙচুর চালাতে দেখা যায় কয়েক জনকে। বেলা ১২টার দিকেও ৩২ নম্বরের ওই বাড়ির অবশিষ্ট দেওয়াল শাবল ও হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতে দেখা গিয়েছে তাঁদের।
এই পরিস্থিতিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, শুক্রবার বিকেল ৪টে নাগাদ বাংলামোটর থেকে বিক্ষোভ মিছিল করবে তাঁর দল। একই সঙ্গে জনরোষের সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে ভাঙচুর বা নাশকতামূলক কাজে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
