সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা শহরের পরিবহন ও ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে রিকশা একটি বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে। রিকশা বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে পরস্পরবিরোধী বাস্তবতা। একদিকে লাখ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস এবং স্বল্প দূরত্বের পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে রিকশার সামাজিক প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যদিকে, ট্র্যাফিক জ্যাম সৃষ্টি ও সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য একে দায়ী করে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও উচ্ছেদ অভিযান। এ বিতর্কের মধ্যেই যখন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) এবং অন্যান্য বিভাগ রিকশা ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত সমাধানের প্রস্তাব নিয়ে আসে, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভার্চুয়াল জগতে নেটিজেনরা তাকে গঠনমূলক আলোচনার বিষয় না বানিয়ে, ‘ট্রোল’ এবং বিদ্রুপে পরিণত করেছে। এই ট্রোলিং কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে হেয় করেনি, বরং দেশের জটিলতম একটি সমস্যার বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানে নাগরিক সমাজের আদর্শিক ব্যর্থতাকে উন্মোচন করেছে। ঢাকার রাস্তায় রিকশার উপস্থিতি শহরের একটি প্রতীকী পরিচয় তৈরি করেছে, যা অনেক পর্যটক এবং গবেষকের কাছে আকর্ষণীয়। রিকশার রঙবেরঙের হুড এবং পেছনের আঁকা ছবিগুলো বাংলাদেশের লোকশিল্প ও জীবনধারার প্রতিচ্ছবি বহন করে। এটি একটি চলমান শিল্পকর্ম, যা ঐতিহ্য ও আধুনিকতাকে ধারণ করে। এমন একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবহন ব্যবস্থাকে ঢাকা শহর থেকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা বা এর ওপর অযৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে একটি অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
কোনো সমস্যার মূল চিহ্নিত না করে, কেবল তার উপরিভাগের লক্ষণগুলো দূর করার চেষ্টা করা প্রকৌশলগত বা আদর্শিক কোনো দিক থেকে গ্রহণযোগ্য নয়। রিকশা যদি সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তবে সমস্যাটি রিকশার নয়, বরং অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণে। তাই, রিকশাকে উপড়ে ফেলা বা নির্মূল করার চেষ্টা না করে, এর ঐতিহ্য ও কর্মসংস্থানের দিক বিবেচনা করে একে আধুনিক ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বিতভাবে টিকিয়ে রাখার সমাধান খোঁজাই ছিল বুয়েট গবেষকদের আদর্শিক ও বিচক্ষণমূলক পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকা শহরে আনুমানিক পাঁচ থেকে সাত লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রিকশাশিল্পের সঙ্গে জড়িত, যার মধ্যে বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। এই বিশাল কর্মসংস্থান এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের গুরুত্ব অনুধাবন করেই বুয়েটের গবেষকরা রিকশাকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল না করে বরং একে সমন্বিত ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনার একটি অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখান। তাদের মূল প্রস্তাবনা ছিল রিকশাকে নির্দিষ্ট রুট ও নির্দিষ্ট সময়ে চলার অনুমতি দেওয়া এবং কিছু প্রধান সড়ক থেকে রিকশা চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা। রিকশা নিয়ে গবেষণামূলক সমাধান তৈরির ক্ষেত্রে, বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ এহসানের ভূমিকা অত্যন্ত অগ্রণী। তিনি শুধু একজন দেশীয় শিক্ষাবিদ নন, আন্তর্জাতিকভাবেও তার গবেষণার গভীরতা স্বীকৃত। বুয়েট থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং উন্নত বিশে^র পরিবহন প্রকৌশল নিয়ে তার দীর্ঘদিনের গবেষণা, তাকে ঢাকার রিকশার মতো স্থানীয় চ্যালেঞ্জের একটি টেকসই ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান দিতে অনুপ্রাণিত করে। তিনি দীর্ঘকাল ধরে রিকশার নিরাপত্তা এবং এর নকশার মানোন্নয়ন নিয়ে কাজ করে আসছেন।
ড. এহসান এবং তার গবেষক দল রিকশার নকশা নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে, বর্তমানে প্রচলিত রিকশাগুলো যাত্রী ও চালক উভয়ের নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষত, রিকশার ব্রেকিং সিস্টেম এবং এর ভারসাম্য (Stability) প্রায়ই ত্রুটিপূর্ণ থাকে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এই সমস্যার সমাধানে বুয়েট গবেষকরা রিকশার ব্রেকিং কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখতে পান যে, একটি রিকশার জরুরি ব্রেক দূরত্ব (Emergency Braking Distance) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, একটি মানসম্মত নকশার ক্ষেত্রে যেখানে ব্রেক দূরত্ব প্রায় ৬-৮ মিটার হওয়া উচিত, সেখানে ঢাকার অনেক রিকশার ক্ষেত্রে তা প্রায় ২০ মিটার। এর কারণ মূলত পুরনো বা নিম্নমানের ব্রেক কেবল ও দুর্বল চাকার ব্যবহার। এই নিরাপত্তা ঘাটতিগুলো দূর করতে বুয়েট দল রিকশার নকশাকে মানসম্মত করার প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে ছিল উন্নতমানের ব্রেক সিস্টেম, গাড়ির ভারসাম্য রক্ষায় সঠিক চাকার ব্যবধান (Wheelbase) এবং হালকা কাঠামো ব্যবহার করা, যাতে রিকশাচালকদের ওপর শারীরিক চাপ কম পড়ে এবং সড়কে দুর্ঘটনা কমে। গবেষক দলের মতে, মানসম্মত রিকশা ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনা প্রায় ৩০% কমানো সম্ভব। বুয়েট গবেষকদের প্রস্তাবনার মূলে ছিল রিকশার ‘শূন্য কার্বন নিঃসরণ’ এবং ‘সামাজিক নিরাপত্তা জাল’ হিসেবে এর ভূমিকা। উন্নত বিশ্বের অনেক শহর, যেমন আমস্টারডাম বা কোপেনহেগেন, যেখানে সাইকেল বা স্বল্পগতির যানকে উৎসাহিত করে ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনায় পরিবেশবান্ধব বিপ্লব আনা হয়েছে, সেই উদাহরণ মাথায় রেখেই বুয়েট সমাধানের পথ খুঁজেছিল। তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে, ট্র্যাফিক জ্যামের মূল কারণ কেবল রিকশা নয়; বরং অপরিকল্পিত ব্যক্তিগত গাড়ি, সড়কে শৃঙ্খলা না থাকা এবং গণপরিবহনের অপ্রতুলতা। কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক ও জনবান্ধব প্রস্তাবনা যখনই গণমাধ্যমে আসে, তখনই ভার্চুয়াল জগতে এর মূল বক্তব্যকে পাশ কাটিয়ে কেবল ‘বুয়েট রিকশা চালানোর পরামর্শ দিয়েছে’ এমন একটি সরলীকরণ করে ট্রোলিং শুরু হয়। ট্রোলিংয়ের প্রধান যুক্তি ছিল : ‘এত বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে তারা কেবল রিকশার সমাধান দিল? তারা কি মেট্রোরেল বা উড়াল সড়ক বানাতে পারে না?’ অথবা ‘বুয়েটের কাজ রিকশা নিয়ে গবেষণা করা, নাকি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন?’ এ ধরনের ভার্চুয়াল প্রতিক্রিয়া কেবল রুচিহীনতা নয়, এটি একটি গভীর আদর্শিক সংকটের প্রতিফলন। এই ট্রোলিং দেখায় যে, সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় অংশ, সমস্যার বহুমাত্রিকতা বুঝতে ব্যর্থ। রিকশা বিতর্কটি একই সঙ্গে একটি সামাজিক, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক এবং প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। বুয়েট যেহেতু দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ, তাই তাদের কাজ কেবল বড় প্রকল্প তৈরি করা নয়, বরং বিদ্যমান জনজীবনের সমস্যাগুলোকে প্রকৌশল ও গবেষণার মাধ্যমে সমাধান করা।
ঢাকা শহরে বর্তমানে নিবন্ধিত ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি এবং এই ব্যক্তিগত গাড়িগুলো সড়কপথের মাত্র ২০ শতাংশ মানুষকে পরিবহন করে, অথচ সড়কের বিশাল অংশ দখল করে রাখে। যেখানে একটি রিকশা ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতিতে চলে, সেখানে ব্যক্তিগত গাড়িগুলোর গতিও জ্যামের কারণে প্রায় একই রকম। বুয়েট চেয়েছিল, ট্র্যাফিক জ্যামের মূল কারণ ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য নিয়ন্ত্রণ করে রিকশার জন্য নির্দিষ্ট লেন বা রুট তৈরি করতে, যাতে এর উপযোগিতা বজায় থাকে এবং বিশৃঙ্খলা কমে। কিন্তু ট্রোলিংয়ের কারণে এই সমন্বিত প্রকৌশলগত ধারণাটি সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। বরং ভার্চুয়াল বিদ্রুপের কারণে এমন একটি জনবান্ধব সমাধান আলোচনার কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেল। এই ঘটনার পেছনে জনগণের একটি বড় অংশের ‘উন্নয়ন ভাবনা’ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সাধারণ মানুষ সম্ভবত মনে করে, ‘উন্নয়ন’ মানে কেবলই আকাশছোঁয়া অবকাঠামো, উড়াল সড়ক বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। তারা যেন রিকশার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী, মানবচালিত ও পরিবেশবান্ধব যানের সমাধানে বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণকে ‘ছোট কাজ’ বা ‘মান-হানি’ বলে মনে করেছে। এই মানসিকতা একটি দেশের প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা। প্রকৃত প্রকৌশল বা সমাধান হলো সেটাই, যা কম খরচে, স্থানীয় বাস্তবতা মেনে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। বুয়েটের গবেষণা সেই মানদণ্ডেই উত্তীর্ণ ছিল, যেখানে তারা স্বল্প আয়ের মানুষের জীবিকা ও পরিবেশের প্রতি অঙ্গীকার রেখে একটি প্রকৌশলগত সমাধান দিতে চেয়েছিল। ভার্চুয়াল ট্রোলিংয়ের মাধ্যমে এই জনমুখী প্রকৌশল আদর্শটিকেই অপমান করা হয়েছে।
সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আমরা এখনো ড. এহসান এবং বুয়েট গবেষকদের দেওয়া বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে, ঢাকার রিকশা সমস্যাকে বিশৃঙ্খলা থেকে আশীর্বাদে রূপান্তর করতে পারি। এ জন্য প্রয়োজন, একটি আদর্শিক পরিবর্তন এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে, বুয়েটের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, অবিলম্বে প্রতিটি রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় এনে একটি নির্দিষ্ট লাইসেন্সিং এবং ফিটনেস মানদণ্ড (যেমন উন্নত ব্রেকিং সিস্টেম ও সঠিক নকশা) নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শহরের প্রতিটি প্রধান সড়কে (যেখানে রিকশা চলে না) বাসের রুটের সঙ্গে সমান্তরালভাবে ‘রিকশা লেন’ তৈরি করা, বিশেষ করে শেষ মাইল সংযোগ নিশ্চিত করার জন্য। উন্নত বিশ্বের ‘সাইকেল সিটি’ মডেলের অনুকরণে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এবং স্বল্প দূরত্বের অঞ্চলগুলোতে রিকশাকে প্রাথমিক যাতায়াত মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা। এই উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে, একদিকে যেমন লাখ লাখ রিকশাচালকের জীবিকা সুরক্ষিত হবে, তেমনি শহর তার নিজস্বতা বজায় রেখে একটি পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে। যেখানে উন্নত দেশগুলো এখন জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত যাতায়াত ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে, সেখানে রিকশা ঢাকা শহরের জন্য একটি ‘রেডিমেড গ্রিন ট্রান্সপোর্ট সলিউশন’ হতে পারে। ট্র্যাফিক জ্যামের জন্য রিকশাকে এককভাবে দায়ী না করে, অপরিকল্পিত ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে প্রকৌশলগতভাবে সঠিক সমাধান। এই বৈজ্ঞানিক ও জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হলে ঢাকা শহর বিশৃঙ্খল রিকশার নগরী না হয়ে একটি ‘টেকসই, কর্মসংস্থানমুখী ও পরিবেশবান্ধব’ নগর হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি লাভ করতে পারে। রিকশা বিতর্কের সমাধানের জন্য প্রয়োজন ছিল বুয়েটের দেওয়া পরিসংখ্যান ও মডেলিংয়ের গভীর আলোচনা। দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান যখন জনজীবনের একটি জটিল সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসে, তখন তাকে সমর্থন না করে উপহাস করা হলে, ভবিষ্যতে অন্য গবেষক বা শিক্ষাবিদরা সমাজমুখী গবেষণায় উৎসাহিত হবেন না। এর ফলে সামাজিক সমস্যা সমাধানে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে আদর্শিক ভূমিকা থাকা উচিত, তা দুর্বল হয়ে পড়বে।
লেখক: সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড
