ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৈরি হওয়া নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে গঠনমূলক ভূমিকায় দেখতে চায় জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এমন বিবেচনা থেকে বিএনপি এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সংসদে দেখতে চায়।
বিএনপি নেতারা বলছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে না থাকায় এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বড় পরিসরে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশে বর্তমান নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি, এনসিপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন আট দলের ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে জামায়াতের লাভবান হওয়ার ঝুঁকি আছে, এমন ভাবনা থেকে এনসিপিকে ছাড় দিয়ে সঙ্গে রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে। এই দিকগুলো বিবেচনায় রেখে এনসিপি ও বিএনপির সমমনা দলগুলোকে ছাড় দিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠতে পারে এমন ৬৩টি আসনে রয়েসয়ে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে।
সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী দলগুলোকে নিজ নিজ প্রতীকে ভোটের মাঠে লড়তে হবে। এমন পরিস্থিতিতে এনসিপি ও বিএনপির সমমনা দলগুলোকে সঙ্গে রাখতে কী কৌশল নেওয়া যায়, সে বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্দেশনা দেবেন। তাই কথা বলতে তিনি লন্ডনে ডেকে নিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে।
সার্বিক দিক বিবেচনায় রেখে বিএনপি গত সোমবার ২৩৭ আসনে দলীয় প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নেতাদের ত্যাগ, যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলো প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে।’ তিনি বলেন, রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে এমন রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে তালিকা দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য আসন খালি রাখা হয়েছে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যাদের যেখানে যোগ্য মনে হবে, তাদের সেখানে ছাড় দেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য বলেন, ফাঁকা রাখা আসনগুলোয় এনসিপি, গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দলগুলোর পাশাপাশি ১২-দলীয় জোটের নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। এর বাইরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের জন্য একটি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছে। আন্দোলনে শরিক দলগুলোর নেতাদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হবে লন্ডনে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৩৭ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে বলেন, এই তালিকার কিছু আসনে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তনও করা হতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এনসিপি নেতাদের কোথায় কোথায় কটি আসন দেওয়া যায়, সে বিষয়ে দলটির সঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বিভিন্ন সময় কথা বলেছেন। এনসিপির জন্য প্রাথমিকভাবে আটটি আসন রাখা হয়েছে। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের জন্য ঢাকা-১১ ও অন্যতম নেত্রী তাসনিম জারাকে রাজধানীর একটি আসনে ছাড় দেওয়া হতে পারে। এর বাইরে বগুড়া-২ আসন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, গণফোরাম সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ঢাকার একটি আসনে, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে এলডিপি একাংশের চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদকে কুমিল্লা-৭, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে এলডিপির অন্য অংশের চেয়ারম্যান শাহাদাৎ হোসেন সেলিম, লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে জাসদ একাংশের সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ঢাকার-১৭ আসন থেকে, পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, নড়াইল-২ আসন থেকে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) সভাপতি ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ আন্দোলনে শরিক দলগুলোর নেতাদের প্রার্থিতায় বিএনপি সমর্থন দিতে পারে।
জোট না করেও বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতার ইঙ্গিত রয়েছে এনসিপি নেতাদের বক্তব্যেও। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গণমাধ্যমকে গতকাল মঙ্গলবার জানান, এবারের নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্বাচনী আসনে কোনো প্রার্থী দেবে না এনসিপি। খালেদা জিয়া বগুড়া, ফেনী ও দিনাজপুরে একটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
বিএনপি প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করার সময় জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টি মাথায় রেখেছে কি না জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, জামায়াতের প্রার্থীদের বিষয়টি মাথায় রাখা হয়নি। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্য এক সদস্য বলেন, আসনে আসনে জামায়াতের কে প্রার্থী, এটি হিসাবে না রাখা হলেও সার্বিকভাবে জামায়াত কী কৌশল নিচ্ছে, তার ওপর বিএনপি নজর রাখছে।
মাদারীপুর-১ আসনে মনোনয়ন স্থগিত : বিএনপি গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ২৩৭টি আসনের মধ্যে মাদারীপুর-১ (শিবচর উপজেলা) আসনের কামাল জামান মোল্লার মনোনয়ন স্থগিত রাখা হয়েছে।
প্রতিবাদ বিক্ষোভ : ২৩৭ আসনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণার পর মনোনয়নপ্রাপ্তদের সমর্থকরা আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়লেও মনোনয়নবঞ্চিতদের সমর্থকরা কিছু স্থানে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। চট্টগ্রাম, মেহেরপুর, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তবে বেশিরভাগ মনোনয়নবঞ্চিত নেতা তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। একই সঙ্গে নোয়াখালী-১ ও ৫, চট্টগ্রাম-১৬-সহ অনেক আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রার্থী ঘোষণার আগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে একাধিকবার। যার কারণে বিক্ষোভ বেশি হয়নি।
চারজনকে বহিষ্কার : মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, হানাহানি, রাস্তা অবরোধসহ নানা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত হওয়ায় চার নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। বহিষ্কৃত নেতারা হলেন স্বেচ্ছাসেবক দলের চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলা সভাপতি আলাউদ্দিন মনি, সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন বাবর, সীতাকুন্ড পৌরসভার আহ্বায়ক মামুন, যুবদলের সোনাইছড়ীর সাধারণ সম্পাদক মমিন উদ্দিন মিন্টু। তারা সবাই দলের নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
