ছবির উৎস, Reuters
-
- Author, ক্যারোলাইন ডেভিস
- Role, পাকিস্তান সংবাদদাতা
-
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় পাকিস্তানের উপস্থিতি অনেককেই আশ্চর্য করেছে।
যদিও, বিষয়টি হয়তো এতোটা আশ্চর্য হওয়ার মতোও নয়।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনীর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুনজরে রয়েছেন। মি. ট্রাম্প মাঝেমধ্যেই তাকে নিজের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এছাড়া আসিম মুনির ইরানকে কীভাবে ‘অধিকাংশ মানুষের চেয়ে ভালোভাবে’ বোঝেন, সেই আলোচনাও করতে দেখা গেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে।
ইরানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নয় – বরং পাকিস্তান মনে করে যে ইরানের সাথে তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আচারে সাদৃশ্য রয়েছে এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্ক ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ।’
পাকিস্তানে কোনো মার্কিন বিমানঘাঁটিও নেই।
আবার মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ ইরান আর আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতা করাতে চায়, তারা যেমন অনিচ্ছাস্বত্ত্বেও এই যুদ্ধের অংশ হয়ে গেছে – পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি।
তাই ইরান আর আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রে পাকিস্তান অনেক হিসেবেই যুতসই পক্ষ।
তবে, যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে শান্তি স্থাপন করা পাকিস্তানের নিজের স্বার্থের জন্যও বেশ জরুরি ও তাৎপর্যপূর্ণ।
তারপরও প্রশ্ন উঠছে যে, নিজেদের দুই প্রতিবেশী – অর্থাৎ ভারত ও আফগানিস্তান – এর সাথে সংঘাতে জড়িয়ে থাকা একটি দেশ কীভাবে নিজেকে শান্তির বার্তাবাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
ছবির উৎস, Reuters
আফগানিস্তানের সাথে গত কিছুদিন ধরে পাকিস্তানের সরাসরি সংঘাত চলছে।
আর প্রতিবেশী ভারতের সাথে সবশেষ গত বছর হওয়া সংঘাত পারমাণবিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে, এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।
এখন পর্যন্ত পাকিস্তান ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের দুই দেশের বার্তা একে অপরকে পৌঁছে দিয়েছে।
এরপর সৌদি আরব, মিসরের মত মুসলিম দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠক আয়োজন করেছে এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনা করেছে এ যুদ্ধের বিষয়ে।
তবে, মনে রাখা দরকার, এই সমঝোতার প্রচেষ্টা চালানো পাকিস্তানের জন্য শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত নাও হতে পারে।
যেসব ঝুঁকি রয়েছে পাকিস্তানের
আমদানি করা তেলের ওপর পাকিস্তান ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আর এই আমদানি করা তেলের বড় অংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে।
“মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পর অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে পাকিস্তানের এ যুদ্ধে বেশি স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে”, বিবিসিকে বলছিলেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান।
“সংঘাত প্রশমনের উদ্দেশ্যে মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখার পেছনে তাদের আগ্রহের কারণও সেটি।”
পাকিস্তানের সরকার মার্চের শুরু থেকে পেট্রোল আর ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে ২০ শতাংশ।
এছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এরই মধ্যে দেশটির সরকারি দপ্তরগুলোতে সপ্তাহে চারদিন কার্যদিবসের নিয়মও চালু করেছে পাকিস্তান।
“যুদ্ধ চলতে থাকলে পাকিস্তানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণে বাড়বে,” বলছিলেন করাচির ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনস্ট্রেশনের পলিটিকাল সাইন্সের অধ্যাপক ফারহান সিদ্দিকি।
সংঘাতের তীব্রতা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি ঠিক কী হবে, তা নিয়েও পাকিস্তানের শঙ্কার কারণ রয়েছে।
ছবির উৎস, Reuters
গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তান একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যার আওতায় এই সমঝোতা হয়েছে যে, ‘কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হলে তা দুই দেশের বিরুদ্ধেই আগ্রসন হিসেবে বিবেচিত হবে’।
কাজেই সৌদি আরব যদি এ যুদ্ধে যোগ দেয় তখন পাকিস্তান কী করবে, সে আলোচনায়ও রয়েছে।
“আমাদের যদি সৌদি আরবের পক্ষ নিয়ে এ যুদ্ধে যোগ দিতে বলা হয়, তাহলে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্ত সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকবে”, বলছিলেন ফারহান সিদ্দিকি।
এদিকে, পাকিস্তান এরই মধ্যে আফগানিস্তানের সাথে পুরোদস্তুর যুদ্ধে রয়েছে।
এখন আরেকটি ফ্রন্টে যুদ্ধে যোগ দিলে শুধু নিরাপত্তার ঝুঁকি নয়, দেশের ভেতরে সরকারের ‘সুনাম’ এর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন মি. সিদ্দিকি।
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় ইরানপন্থী বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে আসে।
পাকিস্তানের মার্কিন দূতাবাস ঘেরাও করতে চাওয়া বিক্ষোভকারীসহ বেশ কয়েকজন ইরানপন্থী বিক্ষোভকারী সেদিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের সাথে সংঘাতে মারা যান।
“পাকিস্তানে সিংহভাগ মানুষ এই যুদ্ধে ইরানের পক্ষে”, বলছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং জাতিসংঘে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা মালিহা লোধি।
“আমি নিশ্চিত যে পাকিস্তানের আইনপ্রণেতারা এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।”
ছবির উৎস, Getty Images
যা অর্জন করতে পারে পাকিস্তান
বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, নিজেদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আসীন করার যে ইচ্ছা পাকিস্তানের, তার পেছনে একটি বড় কারণ বৈশ্বিক কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করা।
“বৈশ্বিক কূটনীতিতে পাকিস্তানের কোনো প্রভাব নেই – এমন সমালোচনা ইসলামাবাদ ইতিবাচকভাবে নেয় না”, বলছিলেন মি. কুগেলম্যান।
“এটি উচ্চ ঝুঁকির কূটনীতি, এ সম্পর্কে প্রশ্নের অবকাশ নেই”, বলছিলেন মালিহা লোধি। “এর ঝুঁকি যেমন বেশি, পরবর্তীতে সফল হলে পুরস্কারের মাত্রাটাও বড়। এটি পাকিস্তানকে বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের সাথে এক কাতারে নিয়ে যেতে পারে।”
কিন্তু যদি তা না হয়? অর্থাৎ মধ্যস্থতায় পাকিস্তান যদি সফল না হয়, তাহলে কী হবে?
মালিহা লোধি মনে করেন, সেক্ষেত্রে ক্ষতির মাত্রা খুব একটা ব্যাপক হবে না।
“তখনও পাকিস্তানকে দেখা হবে এমন একটি পক্ষ হিসেবে যারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছে। আর শেষ পর্যন্ত সফল না হলে তার কারণ হিসেবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ব্যর্থতার চেয়ে, তার দায় বরং একজন অত্যন্ত খামখেয়ালী ও সম্পূর্ণ অবিশ্বাসযোগ্য একজন মানুষের ওপরই বর্তাবে”, বলেন মিজ. লোধি।
তবে, মি. কুগেলম্যান মনে করেন, এতো আলোচনার প্রচেষ্টার পরও যদি যুদ্ধ চলমান থাকে, তাহলে পাকিস্তান হয়ত শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।
ছবির উৎস, Getty Images
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে তা বোঝা না গেলেও পাকিস্তান যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে নিজেদের সুসম্পর্ক কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
পাকিস্তান কিছুদিন আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিল গত বছরে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় ‘গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ’ নেয়ার জন্য।
“পাকিস্তান ট্রাম্পকে এক ধরনের বিজয় দিয়েছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক উষ্ণতা পেয়েছে”, বলছিলেন মিজ লোধি।
আমেরিকার সুনজরে থাকার পরও ইরানের সাথে পাকিস্তানের আলোচনার টেবিলে বসার মতো ভাবমূর্তিও ইসলামাবাদ ধরে রেখেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
“আমার মনে হয়, ইরানের সাথে আলোচনার জন্য পাকিস্তানই এ মুহুর্তে সবচেয়ে যথাযথ পক্ষ, কারণ তাদের সম্পর্কে বহির্বিশ্বে এমন ধারণা নেই যে তারা ইসরায়েলপন্থী বা শতভাগ আমেরিকাপন্থী”, বলছিলেন অধ্যাপক ফারহান সিদ্দিকি।
তবে, পাকিস্তান মধ্যস্থতা করতে চাইলেও শান্তি চুক্তি বা সমঝোতা অর্জন করা হয়তো বেশ কঠিন হবে।
কারণ ইরান ও আমেরিকার একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস এখন চরম মাত্রায়।
আর দুই পক্ষেরই সমঝোতার শর্তগুলো এমন যা অপর পক্ষের জন্য মেনে নেয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাই বিশ্লেষকদের মত, বর্তমান প্ল্যান কাজ না করলে এই সমীকরণগুলোও পাকিস্তানের বিবেচনায় রাখা জরুরি।
