একসময় উত্তরাঞ্চলকে মঙ্গাপীড়িত এলাকা বলা হতো। বছরে দুবারসেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর এবং মার্চ থেকে এপ্রিল মাসে ফসল রোপণ ও উত্তোলন হতো। অভাব-অনটনে অনেক কৃষক কাজ না পেয়ে আত্মহত্যাও করেছিল। আজ সেই মঙ্গা যেন এক অতীত। অভাব-অনটন নেই। নেই না খেয়ে মরে যাওয়ার সেই দিন। তাই কৃষক থেকে কায়িক শ্রমিক সবার মন ফুরফুরে।

নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলে হেমন্তের অঙ্গনে দুরন্ত শীত ঢুকে পড়েছে। কুয়াশা ও শিশিরের দারুণ এক প্রকৃতি বিরাজ করছে মিষ্টি ছায়া-রৌদ্রে। বাংলায় অগ্রহায়ণ মানেই শস্যের উৎসব; ফসল ঘরে তোলার তোড়জোড়। এখন ভোরে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে পাকা ধানের ওপর বিছিয়ে থাকছে কুয়াশার চাদর। তেমনি আগাম আলুসহ শীতের বিভিন্ন শাকসবজির সবুজ ক্ষেতগুলো প্রকৃতিকে করেছে অপরূপ। আর সন্ধ্যায় ঘাস-লতা-পাতা-ফুল-ফসলের গায়ে লেগে থাকছে শিশিরের ঘ্রাণ। হেমন্তের অগ্রহায়ণের নবান্নে আমন ধান এখন ঘরে ঘরে। ধানের পর এবার আগাম আলু উত্তোলন শুরু হয়েছে। তাই আলুচাষীরা আগাম আলু আলোয় উদ্ভাসিত হতে চায়।

গত বছর ব্যাপক লোকসানের পরেও চলতি বছরে নীলফামারীতে আগাম জাতের আলু চাষে ভাটা পড়েনি, বরং সমান উদ্যমে আলু চাষে নেমে পড়েন কৃষকরা। তারা জানান, গত বছরে আলু চাষে ব্যাপক লোকসান হয়েছে। এবার চলতি বছরে এ অঞ্চলে আলুর চাষ ভালো হয়েছে। নতুন আলুর বাজার দর অনেকটাই ভালো। হয়তো নতুন আলুর দাম পেয়ে গত বছরের লোকসানের বোঝাটা কমিয়ে ফেলতে পারবেন চাষিরা।

আগাম আলুর পাশাপাশি মৌসুমের চাষও চলছে একসঙ্গে। দরপতনের আশঙ্কা থাকলেও কৃষকদের বিশ্বাস, নতুন আলুর ভালো দাম মিললে আগের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে যাবে। তাই চাষিরা সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি অধিক ঝুঁকি নিয়ে আলু রোপণ করেছিল। রোপণের ৫৫ ও ৬০ দিন পর নতুন আলু উঠতে শুরু করেছে। 

গত রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আগাম আলুর সুতিকাগার বলে পরিচিতি নীলফামারীর কিশোরীগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আগাম আলু উত্তোলন শুরু করেছেন কৃষকরা। জমিতে নারী-পুরুষের পাশাপাশি কিশোররাও আলু উত্তোলনে সহযোগিতা করছে।

উত্তর দুরাকুটি পশ্চিমপাড়া গ্রামের আলুচাষি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমি গত বছর চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। আলুর দাম কম থাকার কারণে চার বিঘা জমির ১০৫ বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করি। সেখান থেকে ১০ বস্তা আলু বের করে ৪০ শতক জমিতে আগাম আলু চাষ করি। হিমাগারে থাকা বাকি ৯৫ বস্তা আলু বিক্রি করে হিমাগারের খরচ বাদ দিয়ে ১৫ হাজার টাকা পেয়েছি। তাই বর্তমানে আগাম ৪০ শতক জমির আলু উত্তোলন করে ট্রাক ভাড়া করে ঢাকার কারওয়ানবাজারে নিয়ে যাচ্ছি। যদি দাম ভালো পাই তাহলে লোকসান পুষিয়ে নিতে পারব।’

কবিরাজপাড়া গ্রামের কৃষক সোহাগ মিয়া বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করেছিলাম। বৃষ্টির কারণে এক বিঘার মতো আলুক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। আজকে আমার জমির বাকি আলুটুকু উত্তোলন শুরু করলাম। আশা করছি, ১০ বস্তা হবে। আমি জমিতে ঢাকার পাইকারদের কাছে প্রতিকেজি আলু ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে দিলাম।’

সূত্রমতে, চলতি বছর রংপুর কৃষি অঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় আলু চাষে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ এক হাজার ৭০০ হেক্টর। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় আলুর গাছ তেমন বড় ধরনের রোগের কবলে পড়েনি।

নীলফামারীর কৃষি দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর কৃষকরা ২৩ হাজার ১৫৬ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করেছিল। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২২ হাজার হেক্টর। জেলার ১১টি হিমাগারে ৪ হাজার ২৫০ টন খাবার আলু এবং ২৫ হাজার টন বীজ আলু মজুদ রয়েছে। জেলার বাইরে আরও আলু সংরক্ষিত আছে।

কিশোরীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হাকিম বলেন, ‘এ অঞ্চলে আগাম আলু উত্তোলন শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহ পরে নতুন আলু বাজারে ভরে যাবে। আশা করছি, কৃষকরা নতুন আলুর ভালো দাম পাবেন, এতে তারা গত বছরের ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।’





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *