গাজায় যুদ্ধবিরতি চললেও আতঙ্ক কাটেনি ফিলিস্তিনিদের। যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজা উপত্যকার একাধিক স্থানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এসব হামলায় নিহত হয়েছে শতাধিক ফিলিস্তিনি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন আশঙ্কা- সীমারেখা হিসেবে আঁকা হলুদ লাইন এখন যেন ক্রমেই বাস্তব রূপ নিচ্ছে। ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির তথাকথিত অদৃশ্য এই সীমারেখা যেন ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের গতিপথ পাল্টে দেওয়ার হুমকি হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এখন প্রতি ২০০ মিটার অন্তর হলুদ রঙের কংক্রিটের ছোট ছোট পিলার বসাচ্ছে যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায়ে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল নির্ধারণের জন্য। এই লাইন কার্যত গাজাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পর পশ্চিমাংশে হামাস নিজেদের কর্র্তৃত্ব ফেরাতে চাইছে। তারা প্রকাশ্যে দমন করছে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী ও গ্যাং সদস্যদের; যাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের মদদপুষ্ট হওয়ার অভিযোগ আছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের গাজার উত্তর ও দক্ষিণ সীমান্তসংলগ্ন পূর্বাংশে আইডিএফ তাদের সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা জোরদার করছে। যে বা যারা ভুলেও এই লাইন পার হওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের ওপর গুলি চালাচ্ছে তারা।

হলুদ লাইনের পূর্ব পাশের (আইডিএফের নিয়ন্ত্রিত এলাকা) একসময়ের বাসিন্দা খালেদ আল-হুসাইন বলেন, আমাদের এলাকায় ওই হলুদ লাইনগুলো স্পষ্ট দেখা যায় না। কোথা থেকে শুরু, কোথায় শেষ, কিছুই জানি না। তিনি বলেন, যেই আমরা ঘরের কাছাকাছি যাই, চারদিক থেকে গুলি ছুটতে থাকে। ছোট ছোট ড্রোন, ওই কোয়াডকপ্টারগুলো, মাথার ওপর ঝুলে থাকে, আমাদের প্রতিটি নড়াচড়া দেখে। গতকাল এক বন্ধুর সঙ্গে হাঁটছিলাম, হঠাৎ প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ শুরু হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, গুলি থামা পর্যন্ত ওভাবেই ছিলাম। ঘরে ফিরতে পারিনি। আমার মনে হয়, যুদ্ধটা শেষই হয়নি। আমি যদি এখনো ঘরে ফিরতে না পারি, তাহলে এই যুদ্ধবিরতির মানে আসলে কী? কিন্তু সবচেয়ে ভয় পাই এই ভেবে এই লাইন হয়তো আর উঠবে না, কেউ হয়তো আর কখনো আমাদের নিজ ভূমিতে ফিরতে দেবে না।

রবিবার ইসরায়েল জানিয়ে দিয়েছে, গাজার নিরাপত্তা তাদেরই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, কোথায়, কাকে আঘাত করবে এবং কোন দেশকে গাজায় শান্তিরক্ষায় অংশ নিতে দেবে এসব সিদ্ধান্ত ইসরায়েল নিজেই নেবে। তিনি বলেন, আমরা নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই রক্ষা করব এবং নিজের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করব। এর জন্য কারও অনুমতি আমাদের দরকার নেই।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের আদেশে ওই হলুদ লাইনে গুলি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ১৯ অক্টোবর রাফাহ শহরে এক হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনার নিহত হওয়ার পর এই নির্দেশ জারি করা হয়। যুদ্ধবিরতির দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে, কিন্তু প্রতিদিনই এখনো গড়ে ২০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন, বেশির ভাগই ওই হলুদ লাইনসংলগ্ন এলাকায়। ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষদের খুব কমই কেউ ফিরে যেতে সাহস করছেন আইডিএফ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে। যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌঁছানোও এখন দূরবর্তী স্বপ্ন। সেই পর্যায়ে হামাসকে নিরস্ত্র করে একটি বহুজাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীর হাতে প্রশাসন হস্তান্তর এবং আইডিএফের ওই হলুদ লাইন থেকে আরও পিছু হটার কথা ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহুর জোটের ডানপন্থিরা এমন প্রত্যাহার বা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের তীব্র বিরোধিতা করছে।

এই অচলাবস্থার মধ্যেই হলুদ লাইনটি আরও স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমে এটি এখন প্রায়ই ‘নতুন সীমান্ত’ নামে উল্লেখ করা হচ্ছে। ইয়েদিওথ আহরোনথ পত্রিকায় সামরিক প্রতিবেদক ইয়োয়াভ জিতুন লিখেছেন, এই লাইনটি ক্রমে একটি উচ্চ, উন্নত প্রাচীরে রূপ নেবে, যা গাজাকে আরও ছোট করবে, পশ্চিম নেগেভকে বড় করবে এবং সেখানে নতুন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পথ খুলে দেবে। মানবাধিকার সংস্থা রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তা জেরেমি কোনিনডাইক বলেন, এটা আসলে ধীরে ধীরে গাজা দখলের প্রক্রিয়া। ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, হলুদ লাইনে আইডিএফের অবস্থান মানে গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা তাদের দখলে থাকবে। কিন্তু বিবিসির স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন চিহ্নগুলো প্রস্তাবিত সীমারেখার চেয়ে কয়েক শ মিটার ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে অর্থাৎ আরও এক দফা ভূমি দখল। এ বিষয়ে আইডিএফের মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আগের এক বিবৃতিতে শুধু বলা হয়েছিল, ভূমিতে কৌশলগত স্পষ্টতা আনতে ৩ দশমিক ৫ মিটার উচ্চ কংক্রিটের স্তম্ভে হলুদ রঙের দণ্ড বসানো হচ্ছে।

এখন যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হলো গাজা ক্রমেই দ্বিখণ্ডিত হচ্ছে। ২১ লাখ বেঁচে থাকা মানুষের অর্ধেক এখন গাদাগাদি করে আছে এক অংশে। আয়মান আবু মানদিল নামে এক গাজাবাসী বলেন, হলুদ লাইন সালাহউদ্দিন সড়ক থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। গাজা উপত্যকার এই প্রধান সড়কটি উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গেছে। ৫৮ বছর বয়সী ৯ সন্তানের জনক মানদিলের বাড়ি ছিল আল-কারারার পূর্ব অংশে, যা এখন আইডিএফের দখলে। তিনি বলেন, ইসরায়েলি সেনারা সেখানে ক্রেন, ওয়াচটাওয়ার, ট্যাংক বসিয়েছে। তারা প্রতিটি নড়াচড়া নজরদারি করছে এবং কেউ কাছে গেলে গুলি চালাচ্ছে। আমরা নিজের চোখে ওই হলুদ চিহ্নগুলো দেখিনি। কারণ, যে কেউ কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। মনে হয় যেন নিজের জমির দিকে হাঁটা এখন অপরাধ।

এই বিভাজন ও সহিংসতার মূল কারণ হলো যুদ্ধবিরতির অস্পষ্টতা। ‘ট্রাম্প শান্তি পরিকল্পনা’ নামের ২০ দফা নীতিমালায় কোনো ধাপ বা সময়সীমা ছিল না, কেবল অস্পষ্ট লক্ষ্যগুলোর তালিকা। দাতব্য সংস্থা মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনসের নীতিনির্ধারক রোহান ট্যালবট বলেন, এটি অবিশ্বাস্যভাবে অস্পষ্ট। এখন ইসরায়েলি সরকার, আমেরিকা, আন্তর্জাতিক সমাজ ও মানবিক সংস্থাসহ সবাই নিজেদের মতো করে এই যুদ্ধবিরতি ব্যাখ্যা করছে ও নিজেদের স্বার্থে চালনা করতে চাইছে। তিনি আরও বলেন, দশকের পর দশক ধরে পাওয়া ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিখতে হবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যেকোনো ‘অস্থায়ী ব্যবস্থা’ খুব দ্রুত স্থায়ী হয়ে যায়। এই অবস্থায় গাজার অর্ধেক জনগণ এখনো ঘরে ফিরতে পারছে না, পুনর্গঠনের কথাও ভাবতে পারছে না। যুদ্ধবিরতির যে আশা জেগেছিল, তা দ্রুত ম্লান হয়ে যাচ্ছে। খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চল আবাসন আল-কবিরার বাসিন্দা সালাহ আবু সালাহ। যুদ্ধবিরতির কারণে তিনি এখন ভুল পাশে পড়ে গেছেন, হলুদ লাইনের ওপাড়ে- যেখানে তার ঘর, কিন্তু প্রবেশাধিকার নেই। তিনি বলেন, ‘প্রতিবার যখন ঘরের দিকে যাই, দেখি নতুন ধ্বংস, নতুন সেনা অগ্রযাত্রা। মনে হয় যুদ্ধটা যেন কখনো শেষই হয়নি।’ তিনি বলেন, আমার ভয় হয়, সেনারা হয়তো সত্যিই নতুন সীমান্ত তৈরি করছে, যা আমরা আর কখনো পার হতে পারব না।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *