গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনের পতন হওয়ার পর, সাধারণ মানুষের মধ্যে বহুমুখী গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা জন্ম নেয়। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গণতন্ত্রের পথে যাত্রা কখনো মসৃণ হয় না। কারণ, পুরনো অনেক অগণতান্ত্রিক চর্চা গণতান্ত্রিক চর্চার পথে অনবরত বাধা দেয়। যারা ক্ষমতায় যান, তাদের পক্ষে পুরনো পথে হাঁটা সহজ। কিন্তু নতুন পথে হাঁটতে গেলে অনেক ধৈর্য, বিচক্ষণতা এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। একইসঙ্গে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়ে সাধারণ ঐকমত্য প্রয়োজন। অনেক সময় সেই পথে হাঁটতে গেলে যে সাফল্য আসবেই, তা নয়। মাঝে মাঝে হোঁচট খেতে হয়। যে কারণে, বেশিরভাগ বিভিন্ন দলীয় সরকার পুরনো পথেই হাঁটে। এর আগে ১৯৯০ সালে একবার সামরিক শাসনের পতন হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। তারপর যে নতুন যাত্রা শুরু হয়, সেই যাত্রা প্রথম দিকে কিছুটা হলেও এগিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে পরপর তিনটি একপক্ষীয় নির্বাচন করেছে। এরপর আমরা আবার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালে আরেকবার গণতন্ত্রের পথে হাঁটার সুযোগ পেয়েছি।
প্রতিবারই আমরা রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চার সংকটে পড়ছি। রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদরা, যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন; তারা যদি গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধ না হন, তাহলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব। এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আমরা কীভাবে রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের গণতান্ত্রিক আচরণ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি সত্যিকারভাবে দায়বদ্ধ রাখতে পারব। নির্বাচনের আগে ও পরে সরকারি ও বিরোধী দলগুলোকে যদি আমরা সার্বক্ষণিক দায়বদ্ধতার মধ্যে না আনতে পারি, তাহলে আমরা আবার পথভ্রষ্ট হতে পারি। এর জন্য দরকার মিডিয়া ও নাগরিক সমাজের মতপ্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ যথাযথ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করা। মানুষ যেন নিরাপদে এবং সুস্থভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে, ভোট দিতে পারে। সংঘাত বা সহিংসতা যেন না হয়, এগুলো নিশ্চিত করাই এ সরকারের প্রধান দায়িত্ব। সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে, তারা যেন নির্বাচনে পক্ষপাতহীন থাকে। প্রশাসন এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে বিন্যাস করা দরকার। প্রয়োজনে পুনর্বিন্যাস করবে, কাঠামোর ভেতরে যে পরিবর্তন দরকার, সেটা করবে। আমরা অতীতে দেখেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলো নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করেছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযোগ ওঠেনি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে শুরু থেকে নানা বিতর্ক রয়েছে । যদিও তা হালে পানি পায়নি। তবু সমাজে নানা মাত্রায় অনাস্থা তৈরি হয়েছে। তিনটি রাজনৈতিক দল তিনভাবে অভিযোগ করলেও, আমরা দেখছি এ তিন দলের মধ্যেই দলীয় প্রভাব বাড়ানোর প্রতিযোগিতা রয়েছে। কোথাও জোরজবরদস্তি হচ্ছে, কোথাও কৌশল প্রয়োগ হচ্ছে আবার কোথাও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব তৎপরতা দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য বড় হুমকি। সাধারণভাবে অনেকে ধারণা করেন বর্তমান সরকার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি এ তিন দলের সরকার। কিন্তু এই তিন দলের মধ্যে যদি নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়, সেটা আসন্ন সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের মানুষ যে বড় স্বপ্ন দেখছে, সেই পথে কাঁটা বিছানোর চেষ্টা করছে কেউ কেউ।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন এ দেশের প্রান্তিক, দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগণ থেকে আগত। কারণ কোটা আন্দোলন তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সন্তানের নিশ্চিত কর্মসংস্থানের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল সেখানে। গুলিতে রক্তাক্ত হতে হতে পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে যে দাবি সামনে এসেছে তা হলো দুর্নীতিবাজ, খুনি, অত্যাচারী শাসকের পতন হোক। আমরা বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে চাই। জুলাই-আগস্টের শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান একটা সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল। বাংলাদেশে দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা একটি গভীর দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিপীড়ক শাসক গোষ্ঠীকে উৎখাত করেছে ঐ গণঅভ্যুত্থান। সে সময় বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাক্সক্ষা তীব্রভাবে প্রকাশিত হয়েছে, স্বৈরাচার ও বৈষম্যমুক্ত সমাজের জন্য শক্তিশালী জনমত তৈরি হয়েছে। এমনকি দেয়ালে আঁকা চিত্রগুলোও এমন পরিণত বার্তাই প্রকাশ করেছে। দেয়ালগুলো ঘোষণা করে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ নির্বিশেষে সব বাংলাদেশির সমানাধিকার থাকা উচিত। এগুলোর স্পষ্ট বক্তব্য এটাই যে, ধর্ম পরিচয় দিয়ে কোনো বিভেদ সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য নয়। বাঙালি ছাড়াও আরও বহু জাতির দেশ বাংলাদেশ। তাই জাতিগত বৈষম্য চলবে না। দেয়ালচিত্রে তরুণরা লিঙ্গসমতা ও একটি ন্যায়সংগত বাংলাদেশ দাবি করে। প্রকৃতপক্ষে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে, বৈষম্যের উৎস নির্মূলেরই প্রশ্ন আসে। এ জন্য রাজনৈতিক মতাদর্শও স্পষ্ট করা দরকার হয়। স্বৈরাচারী শাসন দূর হলেও এখনো দেশ জুড়ে মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নানা চেহারায় অব্যাহত রয়েছে। সে কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে সরকার পরিচালনা করছে, তাতে আমরা বিগত সরকারের প্রেতছায়া দেখতে পাচ্ছি। ২০১৪ সালের পর থেকে অনির্বাচিত সরকারের জোরজবরদস্তি, অবৈধ ক্ষমতা আর অদৃষ্টপূর্ব মাত্রায় লুণ্ঠন, অত্যাচার অব্যাহত রাখতে পারায় শাসকদের মধ্যে তৈরি হয় সীমাহীন ঔদ্ধত্য। এ ঔদ্ধত্যই গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের অবস্থা তৈরি করে। আর এ হতাহতের নৃশংসতায় বহু বছরে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় এবং তৈরি হয় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। এ গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে সর্বস্তরের মানুষের অদম্য ভূমিকার কারণে। এখানে অংশ নিয়েছেন ধর্ম, মত, লিঙ্গ, পেশা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক, নিরাশ্রয়, তরুণ, শিশু ও বৃদ্ধ। আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে কেউ ক্ষমতার ব্যবহার করে তার অধস্তনকে নিপীড়ন করবে না, শ্রমজীবী মানুষের হিস্যা আদায় হবে, তাকে নিপীড়িত হতে হবে না, নারীরা নিরাপদে চলাফেরা ও জীবনযাপন করতে পারবে। যেখানে ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষদের বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হতে হবে না। মানুষের লড়াই ততদিন চলবে, যতদিন জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ অতীত ও বর্তমানের সব মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়ন-অত্যাচারের বিচার না হবে। যতদিন বৈষম্য নিপীড়ন ও আধিপত্যের অবসান না হবে, ততদিন মানুষের লড়াই থামবে না।
রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ও অর্থনীতিতে লুটপাট পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এ থেকে খুব সহজে বের হওয়ার তেমন কোনো উপায় নেই। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে অর্থায়ন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সেটা শক্তিশালী গোষ্ঠী বা ব্যক্তির মাধ্যমে হয়ে থাকে, যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং রাজনীতির কাছাকাছি থাকাতেই হয়তো অর্থনৈতিক লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। যে কারণে সরকার দেখেও, না দেখার ভান করে। অতীতে এমনটিই হয়েছে। কিন্তু এবার তো এমনটি হওয়ার কথা নয়! মজুদদার এবং কালোবাজারির দৌরাত্ম্য থামাতে না পারলে, আবার জনমনে ভয়ানক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। সরকার বিষয়টি নিশ্চয়ই আন্তরিকভাবে বিবেচনা করছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। একই সঙ্গে যদি আমরা রাজনৈতিক দলের অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারি বা নির্বাচনে বিপুল অর্থের ব্যবহার কমিয়ে আনা যায়; তাহলে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ও অর্থনীতিতে লুটপাট অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। এ জন্য প্রথমেই দরকার একসঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার। দেশে রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সব ব্যাপারে আমরা যে সংস্কার চাচ্ছি, তার কোনোটাই সম্ভব হবে না, যদি না এসব ব্যাপারে আমরা একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারি। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এবং যে দলই নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা যেন জবাবদিহির বাইরে না যেতে পারে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা নাগরিক সমাজেও আমরা দেখেছি, গণতান্ত্রিক চর্চায় যে ধরনের সহিষ্ণুতার দরকার হয়, ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতার দরকার হয়, আমাদের মধ্যে তার অভাব রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য এখন আরও বেশি প্রকট হচ্ছে। যে কেউ যে কারও সম্পর্কে একটা অভিমত প্রকাশ করে ফেলতে পারে এবং যে কাউকে একটা তকমা লাগিয়ে দেওয়ার চর্চা দেখা যাচ্ছে। এগুলো বহুমত চর্চার ক্ষেত্রে একটা বড় সংকট সৃষ্টি করছে। মনে রাখতে হবে, আমরা বারবার গণতন্ত্রের যাত্রায় হোঁচট খাচ্ছি। ভবিষ্যতেও এ যাত্রা খুব মসৃণ হবে না। সবাইকে ধৈর্য দেখাতে হবে, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হবে। গণতন্ত্র মানেই বহুমতের সমাবেশ। ভিন্নমতকে অস্বীকার করা উচিত হবে না। আমাদের দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা আছে বহু বছর ধরে। নির্বাচনের সময় সেটি আরও প্রকট আকার ধারণ করে। অথচ গণতন্ত্র এবং নির্বাচন মানেই শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটানো। সুতরাং শান্তিপূর্ণভাবে এবং পরস্পরের ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, ধৈর্যের সঙ্গে ভবিষ্যতের রূপরেখায় পথচলাই আমাদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এখন এ অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা কতটা বিচার-বিবেচনা, দক্ষতা, সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা এবং বস্তুনিষ্ঠতা দিয়ে বিষয়গুলো মোকাবিলা করতে পারবেন, সেটিই এখনকার প্রশ্ন। একই সঙ্গে সবকিছু প্রধান উপদেষ্টার কোর্টে ঠেলে দেওয়া ঠিক হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে পরমতসহিষ্ণুতা এবং পরস্পরের প্রতি দৃঢ় ঐক্যই বর্তমান অচলাবস্থা দূর করতে পারে। একই সঙ্গে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকারই সমস্ত অচলায়তনের অবসান ঘটাতে পারে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
