এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশ খেলেছে তিন ম্যাচ। মার্চে ভারতের ম্যাচের আগে যে স্বপ্ন বুনেছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা, তা এখন অনেকটাই ধূসর। তিন ম্যাচে ১ পয়েন্টে গ্রুপ সেরার হিসাবটা ঝুলছে সূক্ষ্ম সুতোয়। পরের তিন ম্যাচ জিতলে একটা আশা থাকবে। তবে তিনের দুটি অ্যাওয়ে ম্যাচ হওয়ায় শতভাগ জয় অসম্ভব চাওয়া। আর যে দলে হাভিয়ের কাবরেরার মতো একজন কোচ আছেন, সে আশা করাই বোকামি। এমনটা মনে করেন ফুটবল সংশ্লিষ্টরা। অনেকেই বিস্মিত এই দেখে যে, দেশের ফুটবল কর্তারাও এক আনাড়ি স্প্যানিশের অরক্ষিত হাতে জাতীয় দল ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকছেন! ম্যাচের পর ম্যাচে ব্যর্থতার পরও বাফুফে কর্তাদের কাবরেরা-প্রীতি জন্ম দিচ্ছে নানা প্রশ্নের।

হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, ফাহামিদুল ইসলাম, হালের জায়ান আহমেদদের সংযুক্তির পর দলের সামর্থ্যে অনেক বেড়েছে। তারপরও জয় ধরা দিচ্ছে না। অভিজ্ঞ কোচ মারুফুল হক এর পেছনে কাবরেরার অপরিপক্বতা ও ভুল সিদ্ধান্তের দায় দেখছেন। জাতীয় দলের সাবেক কোচ ও বর্তমানে আবাহনীর দায়িত্বে থাকা মারুফুলের কথায়, ‘আমরা আসলে খেলার আগেই হেরে গিয়েছি। র‌্যাংকিংয়ে তারা (হংকং) হয়তো এগিয়ে। তবে মাঠের পারফরম্যান্স ও খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত প্রোফাইল তুলনা করলে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে আছে। আমাদের সঠিক চেষ্টায় ঘাটতি ছিল। জয়ের মানসিকতা নিয়ে নামিনি। খেলা দেখে আমার মনে হয়নি আমরা সঠিক অ্যাপ্রোচ নিয়ে খেলেছি। আর দলের অ্যাপ্রোচ নির্ধারণ করেন কোচ। জয়ের ভাবনায় নামলে হয়তো একাদশ অন্যরকম হতো।’

দেশের ফুটবলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারদের তালিকায় শুরুর দিকে থাকবে রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির, হংকংয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশকে এভাবে হারতে দেখে ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন। দলের ব্যর্থতায় তিনি কাবরেরাকে দাঁড় করিয়েছেন কাঠগড়ায়, ‘অযোগ্য, অপরিপক্ব একজন কোচের কারণেই আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। এই কোচ জানেনই না কখন কোন একাদশ খেলাতে হবে, কোন সময় খেলোয়াড় বদলাতে হবে। সাদ উদ্দিনকে কোচ পুরো সময় মাঠে রেখেছেন। অথচ প্রথম ৩০-৪০ মিনিটের পর সাদ তার কাজটা করতেই পারেননি। উল্টো শিশুতোষ ভুলে হংকংকে একাধিক গোল উপহার দিয়েছেন। অথচ কোচ পজিশন বদলে তাকে রাইটব্যাকে নিয়ে গেলেন! জায়ানের মতো গতিসম্পন্ন উইঙ্গারকে নামালেন ম্যাচের ১০-১১ মিনিট বাকি থাকতে। শমিত সোমকে নামানো উচিত ছিল প্রথম গোল পাওয়ার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই। ১৩ মিনিটে পাওয়া লিড বাকি ৭৭ মিনিট ধরে রাখার মতো দল আমরা না। তাই লিড বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত ছিল। একই সঙ্গে নিজেদের ঘর সুরক্ষা করতে হতো। কখন, কোন খেলোয়াড়কে মাঠে প্রয়োজন, সেটাই জানেন না কোচ। এ কারণেই টানা তিন ম্যাচ দল জয় পায়নি।’ সাব্বির কাবরেরাকে বছরের পর বছর রাখা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কোচ ভালো না করলে তাকে ছাঁটাই করাই ফুটবলের সংস্কৃতি। অথচ বাফুফে বছরের পর বছর কাবরেরাকে রেখে দিচ্ছে। আমি সত্য-মিথ্যা জানি না। তবে শুনেছি তাকে নিয়ে নাকি কমিশন বাণিজ্য হচ্ছে। যদি তেমন কিছু হয়, দলের ক্ষতি জেনেও যারা কাবরেরাকে রাখছেন, তাদের ভবিষ্যতে জবাবদিহি করতে হবে।’

বাফুফের কাবরেরা-প্রীতির কারণটা অজানা। অনেকেই মনে করেন চুক্তির মেয়াদপূর্তির আগে কোচ ছাঁটাইয়ে বড় অঙ্কের মাশুল গুনতে হবে বলেই বাফুফে কঠোর হচ্ছে না।

কেবল নিজেই টিকে যাচ্ছেন না। কোনো জাদুমন্ত্রে কাবরেরা বাফুফেকে বাধ্য করেছেন একেক সময় একেক সহকারী নিয়োগ দিতে। ফুটবল বিশ্লেষক আহমেদ শায়েক মনে করেন দলের পারফরম্যান্স খারাপ হওয়ার পেছনে এর দায়ও কম নয়, ‘কয়েক মাস আগেই গোলকিপার মিতুল মারমা দারুণ খেলছিলেন। হঠাৎ তার পারফরম্যান্স নিম্নগামী কেন হলো? কারণ এ বছর তিনটি ফিফা উইন্ডোতে জাতীয় দলের গোলকিপিং কোচ বদল হয়েছে তিনবার। ফলে গোলকিপারদের বিভ্রান্ত হতে হচ্ছে। হেড কোচ তার ইচ্ছেমতো যাকে খুশি তাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছেন।’ হংকং ব্যর্থতার দায় কাবরেরাকে দিয়ে শায়েক যোগ করেন, ‘দায় তো অবশ্যই কোচের। তিনি ২৩ জন নির্বাচন করেন, ম্যাচের একাদশ দেন, বদলিও করান। খেলোয়াড়দের এসবে হাত নেই। কাবরেরা স্কোয়াডে একজনও ব্যাকআপ ডিফেন্ডার রাখেননি। ২১১ ফুটবল খেলুড়ে দেশের ২১০টিই অন্তত দুজন ব্যাকআপ ডিফেন্ডার রাখে। কাবরেরা রেখেছেন হাফ ফিট তপু বর্মণকে। দেখেন, বৃহস্পতিবার ম্যাচটা হারতে হয়েছে শুধুমাত্র ডিফেন্ডারদের ভুলে। ডিফেন্স অর্গানাইজেশন ঠিকঠাক না হলে এমন ভুল হবেই। কোচিং প্যানেলে বড় ঘাটতি আছে। যে কোয়ালিটির খেলোয়াড় দলে আছে, তাদের পরিচালনা করার সামর্থ্য বর্তমান কোচিং স্টাফদের নেই। এখানে পরিবর্তন আনতেই হবে। বাফুফেকে নিতে হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। একজন সত্যিকারের নেতা জানেন কখন নিয়োগ দিতে হয় এবং কখন ছাঁটাই করতে হয়। সঠিক সময়ে কোচকে ছাঁটাই না করলে পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। তাতে ফুটবল নিয়ে মানুষের আগ্রহও কমবে।’

দেশের ফুটবলের বাঁক বদলের স্বপ্ন নিয়ে এসেছেন হামজা চৌধুরী, শমিত সোমরা। তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এসেছেন ফাহামিদুল, জায়নদের মতো প্রতিভা। চেষ্টারও কমতি রাখছেন না। অথচ কোচের অপরিপক্বতায় সব চেষ্টাই ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। এমনটা চলতে থাকলে হামজাদেরও মোহভঙ্গ ঘটতে সময় লাগবে না। আশাহত হয়ে তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে ক্ষতিটা দেশেরই। ফুটবলাঙ্গন তাই কাবরেরা বিদায়ের অপেক্ষায়।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *